শক্তির আসল অর্থ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ছেলেটা মিথ্যা বলেছে।
বাবা বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কিছু বললেন না। ছেলেটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের এক কোণে স্কুলব্যাগটা পড়ে আছে, জুতোর ফিতেটা খোলা।
বাবা শুধু বললেন, “আমার কাছে সত্যিটা বল।”
ছেলেটা চুপ।
“ভুল করলে আমি রাগ করব। কিন্তু মিথ্যা বললে তোকে বিশ্বাস করতে পারব না। কোনটা বেশি খারাপ, সেটা তুই নিজেই বুঝে নে।”
কিছুক্ষণ পর ছেলেটা সত্যিটা বলল।
বাবা তাকে মারলেন না। আবার এমনও করলেন না যে, ভুলটাকে কিছুই মনে হলো না। তিনি শুধু বুঝিয়ে দিলেন—ভুলের একটা পরিণতি আছে, কিন্তু সত্যি বলার দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়নি।
শক্তির আসল অর্থ বোধহয় এখানেই।
আমরা অনেক সময় শক্তি বলতে বুঝি, কে কাকে কত জোরে থামাতে পারে। কে বেশি চিৎকার করতে পারে। কে ভয় দেখিয়ে অন্যকে নিজের কথা মানাতে পারে।
“আমি তোমাকে মারব।”
এই কথার মধ্যে রাগ আছে।
কিন্তু—“আমি চাইলে তোমাকে থামাতে পারি।”
এই কথার মধ্যে সামর্থ্য আছে।
দুটোর পার্থক্য খুব ছোট মনে হলেও আসলে অনেক বড়।
ভয় দেখিয়ে কাউকে সত্যি কথা বলানো যায়, কিন্তু সে সত্যি বলতে শেখে না। সে শেখে কীভাবে পরেরবার ধরা না পড়ে যেতে হয়। তখন ভুল করার চেয়ে ধরা পড়াটাই বড় বিপদ।
একটা স্কুলের করিডোরে দুই শিক্ষককে দেখেছিলাম। একজন দূর থেকেই চিৎকার করে বলছেন, “কতবার বলেছি দৌড়াদৌড়ি করবি না!” ছাত্ররা কয়েক সেকেন্ড থামল। শিক্ষক চলে যেতেই আবার দৌড় শুরু হলো।
আরেক শিক্ষক খুব শান্তভাবে বললেন, “তোমাদের তো নিয়মটা জানা আছে। আবার হলে আমাকে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
কোনো চিৎকার হলো না। তবু সবাই থেমে গেল।
কারণ তারা জানত, কথাটার পেছনে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও আছে।
অফিসেও একই দৃশ্য দেখা যায়। কিছু বস আছেন, যারা সামান্য ভুল হলেই বলেন, “চাকরি খেয়ে দেব।”
কিছুদিন পর ক্যান্টিনে কর্মীরা সেই কথাই নকল করে হাসাহাসি করে। হুমকিটা তখন আর হুমকি থাকে না। একটা পুরোনো সংলাপ হয়ে যায়।
আবার এমন বসও আছেন, যিনি খুব কম কথা বলেন। কিন্তু নিয়ম ভাঙলে যা করার, ঠিক সেটাই করেন। কাউকে অপমান করেন না, চিৎকার করেন না, আবার নিজের সিদ্ধান্ত থেকেও সরে যান না।
তার ঘরে ঢোকার আগে মানুষ একটু ভেবে নেয়।
এটাই নিয়ন্ত্রণ।
শুধু শক্তি থাকা আর শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা এক জিনিস নয়।
কেউ আপনাকে অপমান করল। আপনি সঙ্গে সঙ্গে রেগে গিয়ে তাকে অপমান করলেন। বাইরে থেকে মনে হতে পারে, আপনি জবাব দিয়েছেন।
কিন্তু একটু ভেবে দেখুন—সিদ্ধান্তটা আসলে কে নিল?
আপনি?
নাকি যে মানুষটা আপনাকে রাগিয়ে দিল?
যদি অন্য একজন আপনার রাগের সুইচটা টিপে আপনাকে দিয়ে যা খুশি করিয়ে নিতে পারে, তাহলে আপনার শক্তি কোথায়?
শক্ত মানুষ সবসময় জবাব দেয় না। কখন জবাব দিতে হবে, কখন থামতে হবে—সেটাও সে জানে।
সন্তানকে তাই শুধু শেখানো উচিত নয়, “কেউ তোকে মারলে তুইও মারবি।”
আবার “সবকিছু সহ্য করবি”—এটাও ঠিক নয়।
তাকে শেখাতে হয়, নিজেকে রক্ষা করতে। অন্যায় হলে প্রতিবাদ করতে। দরকার হলে সাহায্য চাইতে। কিন্তু রাগের মাথায় নিজের বিচারবুদ্ধিটা হারিয়ে না ফেলতে।
কারণ ভালো মানুষ হওয়া আর দুর্বল হওয়া এক কথা নয়।
তাই শুধু ভালো হলেই হয় না, নিজের জায়গাটা চিনতে হয়।
কোথায় নরম হতে হবে, কোথায় দৃঢ় হতে হবে, আর কোথায় চুপ করে সরে আসাই সবচেয়ে শক্ত সিদ্ধান্ত—এই পার্থক্যটা বুঝতে হয়।
একদিন সেই ছেলেটা বড় হবে। হয়তো বাবার সেই দিনের কথাগুলো তার আর মনে থাকবে না। হয়তো মনে থাকবে না, ঘরের কোন কোণে স্কুলব্যাগটা পড়ে ছিল।
কিন্তু হয়তো একটা জিনিস মনে থাকবে—ভুল করার পরও সে সত্যি কথা বলতে পেরেছিল।
কারণ সে জানত, সামনে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে, তিনি রাগ করতে পারেন। কিন্তু তাকে ধ্বংস করবেন না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।