শেষ আপসের পর
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ২৪ আগস্ট ২০২৬
“কথা দিচ্ছি শবযাত্রার মতো সুবেশ আর পরিপাটি জীবনে ফিরে যাবো।
যত ক্ষত, যত ঘৃণা উগড়ে দেবো গাঢ়শূন্যতায়;
আর নয় আপসের মতো নম্রতার মেঘ।”
একটা সময় ছিল, ফোনটা বেজে উঠলেই আমি ধরতাম। কথা বলতে ইচ্ছে না করলেও ধরতাম। ওপাশের মানুষটি হয়তো রাগ করে আছে, হয়তো অভিযোগ করবে, হয়তো পুরোনো কোনো হিসাব খুলে বসবে—তবু ধরতাম। মনে হতো, ফোন না ধরলে সম্পর্কটা আরও খারাপ হবে।
পরে বুঝেছি, সব ফোন ধরা জরুরি নয়। সব কথার উত্তরও দিতে হয় না।
এই বুঝতে আমার বেশ সময় লেগেছে।
আমরা ছোটবেলা থেকেই একটা অদ্ভুত শিক্ষা পাই—মানিয়ে চলতে হয়। বড়দের সঙ্গে মানিয়ে চলো, সংসারে মানিয়ে চলো, সম্পর্কের মধ্যে মানিয়ে চলো। কেউ কষ্ট পেলে নিজের কথাটা একটু গিলে ফেলো। ঝগড়া হলে আগে তুমিই চুপ করো।
কথাগুলো শুনতে খারাপ নয়। সংসার, পরিবার, সম্পর্ক—এসব একা একা চলে না। অন্যের জায়গাটা বুঝতে হয়।
কিন্তু কোথাও গিয়ে একটা প্রশ্ন উঠতেই হয়—সবসময় আমিই কেন একটু সরে যাব?
এই প্রশ্নটা মুখে আনতে অনেক সাহস লাগে।
কারণ তার আগে বহুবার শুনেছি, “আরেকটু মানিয়ে নাও।”
এই একটা বাক্য শুনতে শুনতে একসময় সত্যিই মনে হয়েছিল, দোষটা হয়তো আমারই। হয়তো আমি বেশি ভাবছি। হয়তো একটু চুপ থাকলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তাই চুপ থেকেছি। তারপর আরও কিছুদিন। তারপর আরও।
চুপ থাকতে থাকতে একদিন দেখলাম, আমার বলার মতো কথাই আর নেই।
সেখানেই বুঝলাম, আপসেরও একটা শেষ আছে।
তারপর যে কথাটা মাথায় এলো, সেটাই হয়তো এই লেখার শুরু—
“আর নয় আপসের মতো নম্রতার মেঘ।”
নম্রতা আমার কাছে এখনও সুন্দর। কাউকে ক্ষমা করতেও আপত্তি নেই। পুরোনো কোনো সম্পর্কের ভালো দিনগুলোকে অস্বীকার করারও দরকার দেখি না। কিন্তু নিজের সম্মানটুকু বন্ধক রেখে শান্তি কেনার ইচ্ছেটা আর নেই।
কারও সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে কি থাকবে না, তার চেয়েও বড় কথা—সেই সম্পর্কের ভেতরে আমি কে হয়ে যাচ্ছি?
একটা সম্পর্ক যদি আমাকে প্রতিদিন নিজের কথার জন্য লজ্জিত করে, নিজের প্রয়োজনের জন্য অপরাধী বানায়, তাহলে সেখানে টিকে থাকাটাই কি সত্যিই ভালোবাসা?
একসময় এসব প্রশ্ন করতাম না। শুধু সম্পর্কটা বাঁচুক, এই চাইতাম।
এখন ভাবি, সম্পর্ক বাঁচাতে গিয়ে যদি মানুষটাই ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়, তাহলে বেঁচে থাকে আসলে কী?
এই জায়গাটায় এসে অনেক পুরোনো হিসাব বদলে যায়।
যে মানুষটার ওপর রাগ ছিল, তার কথা আর মনে করতে ইচ্ছে করে না। প্রতিশোধের কথাও না। বরং মনে হয়, তাকে নিয়ে এতদিন মাথার ভেতরে যে জায়গাটা আটকে রেখেছিলাম, সেটুকু এবার খালি করি।
ঘৃণাও তো এক ধরনের সম্পর্ক।
মানুষটি হয়তো পাশে নেই, অথচ তার বলা একটি কথা এখনও কোথাও আটকে আছে। নতুন কোনো মানুষ একটু একই রকম আচরণ করলেই পুরোনো ভয়টা ফিরে আসে। একটা দরজা বন্ধ হয়ে গেছে বহু আগে, কিন্তু আমি এখনও তার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
এভাবে কতদিন?
তাই “গাঢ়শূন্যতা” শব্দটা আমার কাছে কেবল শূন্যতা নয়। বরং এমন একটা জায়গা, যেখানে আর কাউকে নিয়ে ভাবতে হয় না। কে কী করল, কেন করল, তার হিসাব খাতায় লিখে রাখতে হয় না।
কিছু কথা সেখানেই রেখে আসতে হয়।
কিছু নাম।
কিছু অপমান।
কিছু অসমাপ্ত প্রশ্ন।
আর কিছু মানুষ, যাদের ক্ষমা করা না গেলেও তাদের আর নিজের জীবনের কেন্দ্র করে রাখা যায় না।
তবে অন্যের দোষ মেনে নেওয়া সহজ। নিজের ভুলের দিকে তাকানো কঠিন।
আমি কোথায় বেশি বিশ্বাস করেছি?
কোথায় না বলার কথা ছিল, অথচ হেসে হ্যাঁ বলেছি?
কোথায় ভালোবাসা হারানোর ভয় আমাকে নিজের মর্যাদা ভুলিয়ে দিয়েছে?
কোথায় আমি ভেবেছি, আরেকটু সহ্য করলে মানুষটা বদলে যাবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুব আরামদায়ক নয়। কিছু উত্তর নিজের বিরুদ্ধেই যায়।
তবু এগুলো এড়িয়ে গেলে আবার একই জায়গায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে।
হয়তো এই কারণেই নতুন জীবন বলতে আমি নতুন কাউকে বুঝি না। নতুন কোনো ঠিকানাও না।
আমি শুধু চাই, পুরোনো সেই অভ্যাসগুলো যেন আর ফিরে না আসে।
কেউ রাগ করবে বলে নিজের কথা চেপে রাখা নয়।
অকারণে ক্ষমা চেয়ে ফেলা নয়।
অন্যের অপরাধের ব্যাখ্যা নিজের মুখে দেওয়া নয়।
ভালোবাসা পাওয়ার জন্য নিজের প্রাপ্যটুকু কমিয়ে দেওয়া নয়।
আর সবচেয়ে বেশি—নিজেকে বোঝাতে থাকা নয় যে, সব ঠিক আছে, যখন আসলে কিছুই ঠিক নেই।
হয়তো এরপরও কিছু দাগ থাকবে।
থাকুক।
আয়নার সামনে দাঁড়ালে পুরোনো দিনগুলো মনে পড়বে। কোনো গান শুনে কোনো মুখ মনে পড়ে যাবে। কোনো বিকেলে হঠাৎ একটা পুরোনো রাস্তা চোখে পড়বে। বুকের ভেতর একটু টান লাগবে।
তার মানে এই নয় যে আমি আবার সেখানে ফিরে যাব।
স্মৃতি থাকবে, ফিরে যাওয়া থাকবে না। ক্ষমা করে দিতে পারি, কিন্তু সেই দরজাটা আর খুলব না।
এইটুকু শেখার পরই হয়তো মানুষ নিজের জীবনটাকে নতুন করে গুছিয়ে নিতে পারে।
বাইরে নয়, ভেতরে।
তাই বলি, কথা দিচ্ছি—শবযাত্রার মতো সুবেশ আর পরিপাটি জীবনে ফিরে যাবো।
শোকের মতো নয়, বরং শেষ হয়ে যাওয়া এক অধ্যায়ের পর।
যত ক্ষত, যত ঘৃণা, যত না-বলা কথা—সব উগড়ে দেবো সেই গাঢ়শূন্যতায়, যেখানে তাদের আর কোনো দাবি নেই।
কিছু দরজা বন্ধ থাকবে। কিছু নাম আর উচ্চারণ করব না। কিছু ফোন আর ধরব না। কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজব না।
কারণ সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি নয়। কিছু প্রশ্নকে পেছনে রেখেও সামনে হাঁটা যায়।
শেষ আপসের পর আমি কারও বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাই না।
শুধু নিজের পাশে দাঁড়াতে চাই।
অনেক দেরিতে হলেও।
এবার যদি ফিরি, নিজের কাছেই ফিরব।
নিজের ভেতরে এমন একটা জায়গা বানাবো, যেখানে ঢোকার জন্য কারও অনুমতি লাগবে না।
দরজাটা হয়তো ছোট হবে।
কিন্তু এবার চাবিটা আমার কাছেই থাকবে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।