চুপচাপ তরুণ কেউ দেখে না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ০২ ডিসেম্বর ২০২৫
“আপনি কি জানেন, একজন তরুণ দিনে শতবার হাসে, কিন্তু রাতে কাঁদে?”
আমার ফেসবুক ফিডে আজ সকালে আরেকটা ছেলের পোস্ট দেখলাম। ছবিতে সে বন্ধুদের সঙ্গে হাসছে, ক্যাপশন “লাইফ ইজ বিউটিফুল”। রাত এগারোটায় তার মা ফোন করে বললেন, “ও আর নেই। গত রাতে গলায় দড়ি দিয়েছে।” ছেলেটার নাম ছিল অর্ণব। আমাদের ক্লাসের। কেউ জানতাম না।
আমি নিজেও তো এমনই। স্টোরিতে গান দিয়ে লিখি “এনজয়িং লাইফ”, কিন্তু রাতে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ভাবি, একটা ঝাঁপ দিলে কি আর কষ্ট থাকবে? এই চিন্তাটা এসে যায়, চলে যায়, আবার আসে। কাউকে বলি না। বললে কী হবে? “ডিপ্রেশনের নাটক করিস না।” “এত কিছু আছে, তবু অসুখী?” এই কথাগুলো শুনতে শুনতে আর বলতে ইচ্ছে করে না।
গত মাসে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড রিমি হঠাৎ গ্রুপ ছেড়ে দিল। জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে?” বলল, “কিছু না, ব্যস্ত আছি।” পরে জানলাম, ওর বাবা-মা ডিভোর্সের কেস করছে। ও একা একা সব সামলাচ্ছিল। আমরা কেউ টের পাইনি। কারণ ওর প্রোফাইলে সবসময় “হ্যাপি ভাইবস ওনলি”।
আমার অফিসের কলিগ সাকিব। বয়স মাত্র আঠাশ। প্রতি মাসে সবচেয়ে বেশি টার্গেট করে। সবাই বলে, “তুই তো রকস্টার।” কিন্তু গত সপ্তাহে ও আমাকে বলল, “ভাই, আমার বুকটা এমন চাপ দেয় যে মনে হয় হার্ট অ্যাটাক হবে। ডাক্তার বলেছে, প্যানিক অ্যাটাক।” ওর বউ জানে না। বাসায় বললে বউ বলবে, “তোমার তো সব আছে, তবু এসব কী?” তাই ও চুপ করে থাকে।
আমার বোন, ক্লাস টুয়েলভে পড়ে। গতকাল রাতে ওর রুম থেকে কান্নার শব্দ পেলাম। দরজা খুলে দেখি, ও ফোন হাতে কাঁদছে। জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে?” বলল, “আমার বন্ধুরা সবাই কাপল ছবি দিচ্ছে। আমার কেউ নেই। আমি কি খুব খারাপ?” আমি হাসলাম। কী বলব? আমি নিজেও তো একা। তবু বললাম, “তুই লুজার না।” কিন্তু আমার মন বলছিল, আমরাও তো একই নৌকায়।
আমরা সবাই একটা খেলায় আছি। যে খেলায় হারার ভয়টা এত বেশি যে জিততেও ভয় লাগে। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি, চাকরি করে বিয়ে, বিয়ে করে বাচ্চা—এই রুটিনের বাইরে গেলেই লোকে বলে, “তুই ক্যারিয়ার নষ্ট করছিস।” আমি যখন বলি, “আমি একটু ব্রেক নিতে চাই, ভ্রমণ করতে চাই”, তখন মা বলেন, “বিয়ে করে ফেল, তারপর যেখানে খুশি ঘুরিস।” আমার বাবা বলেন, “আমাদের সময় এমন ছিল না।” আমি চুপ করে থাকি। কারণ বোঝানো যায় না যে আমার বুকের ভিতরটা কেমন জ্বলে।
রাতে যখন একা থাকি, তখন ফোনটা হাতে নিই। স্ক্রল করি। দেখি সবাই হ্যাপি। কেউ বিয়ে করছে, কেউ বাচ্চার ছবি দিচ্ছে, কেউ নতুন গাড়ি কিনেছে। আমার মনে হয়, আমি একা পিছিয়ে পড়ছি। তারপর ফোন বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে ভাবি, আমার জীবনটা কবে এমন হবে? কবে আমি সত্যিই হাসব?
আমি জানি, আমরা সবাই একই রকম। কেউ কম, কেউ বেশি। কিন্তু কেউ বলে না। কারণ বললে লোকে বলে, “তোর তো সব আছে।” আসলে যা নেই, সেটা কেউ দেখে না। শান্তি নেই। নিজের সঙ্গে কথা বলার সময় নেই। একা বসে কাঁদার জায়গা নেই।
আমি আর পারছি না এই মুখোশ পরে থাকতে। আমি চাই, কেউ একদিন জিজ্ঞেস করুক, “সত্যিই কেমন আছিস?” আর আমি বলতে পারি, “খারাপ আছি। খুব খারাপ।” আর সে যেন শুধু একটু চুপ করে থাকে। আমার পাশে বসে।
তাই আজ থেকে আমি চেষ্টা করব।
যে কষ্টে আছে, তার কাছে যাব।
যাকে ভালোবাসি, তাকে বলব।
কাঁদতে ইচ্ছে করলে কাঁদব।
ভুল করলে বলব, “সরি, আমি ভুল করেছি।”
আর কেউ বললে, “তুই উইক”, আমি বলব, “হ্যাঁ, আমি উইক। কিন্তু অন্তত আমি সত্যি।”
আমরা পারফেক্ট হতে পারব না।
কিন্তু একটু সত্যি হতে পারি।
এটুকু তো পারি, তাই না?
তুমি যদি এই লেখাটা পড়ে থাকো আর তোমার বুকের ভিতরটা কেমন করছে, তাহলে একটা কাজ করো।
আজ রাতে একজনকে মেসেজ করো। শুধু লিখো, “তুই কেমন আছিস? সত্যিটা বল।”
দেখবে, অনেক মুখোশ খসে পড়বে।
আজ অন্তরের কথা বলুন। নিজের অনুভূতি শেয়ার করুন। ভুলকে আলিঙ্গন করুন।
#চুপচাপ_তরুণ #কেউ_দেখে_না #ভিতরের_কষ্ট #আমিও_একা #বলতে_ইচ্ছে_করে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।