বিবেক যখন নিঃশব্দ, সমাজ তখন অন্ধ
লেখকঃ মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধরনঃ সাহিত্যধর্মী বিশ্লেষণধর্মী
তারিখঃ ২৪ অক্টোবর ২০২৫
কিছু কথা আছে, যেগুলো শোনা যায় না—শুধু অনুভব করা যায়। “বিবেক” ঠিক তেমনই এক শব্দ। কোনো গলার আওয়াজ নেই, তবু এর কম্পন মানুষের অন্তরকে কাঁপিয়ে দিতে পারে।
কিন্তু আজকাল মনে হয়, এই শব্দটা হারিয়ে গেছে। আমরা এখন এমন এক পৃথিবীতে আছি যেখানে চিন্তা করা ক্লান্তিকর, প্রশ্ন করা ঝুঁকিপূর্ণ, আর নীরব থাকা নিরাপদ।
হুজুরের বাড়িতে মিলাদ হয় না, ডাক্তারের বউয়ের সিজার লাগে না, গণক নিজের ভাগ্য বদলাতে পারে না, আর পীর কখনো মাজারে টাকা দেয় না।
এই কথাগুলো শুধু বিদ্রূপ নয়—এগুলো বাস্তবতার আয়না।
আমরা এমন মানুষদের অনুসরণ করি, যারা নিজের জীবনে তাদের কথার ছায়াও ফেলতে পারে না। অথচ আমরা বিশ্বাস করি, তাদের হাতেই আমাদের পরিণতি নির্ভর করছে। এটা হাস্যকর নয়—এটা করুণ।
মানুষ স্বভাবতই ভীরু। সে প্রশ্ন করতে ভয় পায়, কারণ প্রশ্ন করলে একা হতে হয়।
তাই সে ভিড়ের সঙ্গে চলতে শেখে। যেভাবে নদীর পানি নিজের স্রোতে নয়, সাগরের টানে এগোয়,
তেমনি আমরাও অন্যের চিন্তায় ভেসে যাই।
সমস্যাটা এখানেই— আমরা বিশ্বাসকে এতটাই বড় করে তুলেছি যে, যুক্তি সেখানে জায়গা পায় না।
আমরা ভাবি—যে বেশি বলে, সে-ই বেশি জানে।
যে গম্ভীর মুখে কথা বলে, তার কথাই সত্য।
আর এইভাবে ধীরে ধীরে, আমরা নিজেদের চিন্তার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি।
বিবেক—যেটা একসময় আমাদের পথ দেখাতো,
এখন সেটাই নিঃশব্দ হয়ে গেছে। কারণ আমরা তাকে শোনার সময় দিই না। আমরা এতটা ব্যস্ত অন্যের বিশ্বাসে, যে নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বরকেই ভুলে গেছি।
আজ সমাজে পাশে দাঁড়িয়ে ভরসা দেওয়ার মানুষ নেই। সামনে দাঁড়িয়ে পথ দেখানোর মানুষ নেই।
কিন্তু পেছনে দাঁড়িয়ে সমালোচনা করার মানুষের অভাব নেই।
সবাই এখন বিচারক, কিন্তু কেউ নিজের আয়নায় তাকায় না।
এই যুগে মতামত খুব সস্তা, কিন্তু মনুষ্যত্ব ভীষণ দুষ্প্রাপ্য।
যেখানে মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করতে লজ্জা পায়, সেখানে সততা বিলাসিতা হয়ে যায়।
আর যেখানে প্রতিটি সত্যকে ব্যঙ্গ করা হয়,
সেখানে বিবেক টিকে থাকে কেবল বইয়ের পাতায়।
তবু আশার কথা আছে। ইতিহাস বলে, প্রতিটি অন্ধকার যুগেই কিছু মানুষ ছিল,
যারা একা হলেও প্রশ্ন করেছে, দাঁড়িয়েছে, মুখ খুলেছে।
তারা জানত—সত্য বললে মানুষ রাগ করবে,
তবু তারা থামেনি। কারণ তাদের বিবেক ছিল জাগ্রত।
বুদ্ধ একা ছিলেন, সক্রেটিস একা ছিলেন,
রবীন্দ্রনাথও নিজের সময়ের ভিড়ে অনেক সময় অপরিচিত ছিলেন।
তাদের মতো মানুষরা সমাজ বদলাতে চায়নি,
তারা শুধু নিজের ভেতরের আলো জ্বালাতে চেয়েছিল।
আর সেই আলোই পরে অন্যদের পথ দেখিয়েছে।
আমরাও পারি, যদি আমরা নিজের কাছে সৎ হই।
বিবেককে জাগানো মানে বড় কোনো তত্ত্ব শেখা নয়, বরং ছোট ছোট জায়গায় নিজের মানবতা ফিরিয়ে আনা—
যেখানে মিথ্যা শুনে হাসি না, অন্যায় দেখে চুপ থাকি না, আর কারো কষ্ট দেখে মুখ ফিরিয়ে নিই না।
বিবেক কখনো চিৎকার করে না, সে শুধু নীরবে ফিসফিস করে—
“তুমি ঠিক আছো তো?”
এই ফিসফিসানিটাই শুনতে শেখা দরকার,
কারণ যেদিন মানুষ নিজের বিবেককে শুনতে বন্ধ করে দেয়,
সেদিন থেকেই সমাজ অন্ধ হয়ে যায়।
#বিবেক_জাগরণ #চিন্তার_স্বাধীনতা #মানবতা #সত্যের_পক্ষে #অন্ধবিশ্বাসের_বিরুদ্ধে #আত্মচেতনা #বোধোদয় #সমাজ_বোধ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।