প্রশ্ন থেমে গেলেও ভুল থেমে থাকে না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
১ নভেম্বর ২০২৬
শিক্ষক বোর্ডে একটি প্রশ্ন লিখে ছাত্রদের দিকে তাকালেন। উত্তর দেওয়ার জন্য কয়েকজন হাত তুলল। পেছনের বেঞ্চে বসা ছেলেটি হাত তুলে বলল, “স্যার, আপনার কথাটা কি সব সময় ঠিক?”
শিক্ষক কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “তুমি কি আমার চেয়ে বেশি জানো?”
ছেলেটি আর কিছু বলল না। খাতার পাতায় চোখ নামিয়ে নিল।
সেদিন ক্লাসে পাঠ শেষ হয়েছিল, কিন্তু ছেলেটির প্রশ্নের উত্তর আর পাওয়া যায়নি।
একটি সমাজেও এমন ঘটনা ঘটে। সেখানে প্রশ্ন করা ধীরে ধীরে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেউ কোনো সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা চাইলে তাকে অবাধ্য বলা হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের ভুল ধরিয়ে দিলে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের বদনাম করা হচ্ছে। পরিবারের কোনো প্রচলিত সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্তান কথা বলতে চাইলে শুনতে হয়, বড়দের সঙ্গে তর্ক করতে নেই।
এভাবে একসময় মানুষ প্রশ্ন করার আগে নিজের কথাগুলো নিজেই আটকে দেয়।
সমস্যাটা শুধু এই নয় যে মানুষ প্রশ্ন করতে ভয় পায়। আরও বড় সমস্যা হলো, অনেক ক্ষেত্রে উত্তর দেওয়ার আগেই ঠিক করে রাখা হয় কোন উত্তরটি গ্রহণযোগ্য। প্রশ্নটি কী, তার পেছনে যুক্তি আছে কি না, কিংবা প্রশ্নকারী কোনো বাস্তব সমস্যার কথা বলছে কি না, সেসব আর গুরুত্ব পায় না। গুরুত্ব পায় কে প্রশ্ন করেছে এবং প্রশ্নটি কার স্বার্থে আঘাত করেছে।
একটি অফিসের কথা ভাবুন। একজন কর্মী হিসাবের খাতায় ভুল দেখতে পেলেন। তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানালেন। ভুলটি সংশোধন করার বদলে কর্মকর্তা যদি বলেন, “আপনি কি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন?” তাহলে সেখানে কাজের চেয়ে পদমর্যাদা বড় হয়ে উঠল। পরেরবার কর্মীটি হয়তো ভুল দেখেও চুপ থাকবেন। কারণ তিনি বুঝে গেছেন, ভুল ধরিয়ে দেওয়ার চেয়ে চুপ থাকা নিরাপদ।
পরিবারেও একই চিত্র দেখা যায়। বাবা-মা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন। সন্তান অন্য পেশায় যেতে চায়। সে নিজের ইচ্ছার কথা বলতেই শুনতে হলো, “আমরা কি তোমার খারাপ চাই?” কথাটি ভালোবাসা থেকে বলা হতে পারে। কিন্তু সন্তানের নিজের পছন্দ, যুক্তি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলার অধিকারও তো আছে। ভালো চাওয়ার অর্থ এই নয় যে তার হয়ে জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত অন্য কেউ নেবে।
প্রশ্নের অধিকার মানে কাউকে অসম্মান করার অধিকার নয়। কারও ব্যক্তিগত অপমান করা, মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো কিংবা প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী বলা প্রশ্ন করার স্বাধীনতার মধ্যে পড়ে না। প্রশ্নেরও দায়িত্ব আছে। যে প্রশ্ন করবে, তারও তথ্য জানা, যুক্তি বোঝা এবং নিজের বক্তব্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার প্রস্তুতি থাকা দরকার।
একইভাবে, যে উত্তর দেবে তারও দায়িত্ব আছে প্রশ্নটি মন দিয়ে শোনার। উত্তর জানা না থাকলে তা স্বীকার করা অসম্মানের নয়। ভুল হলে সংশোধন করাও দুর্বলতা নয়। বরং নিজের অবস্থান যাচাই করার এই মানসিকতাই একজন মানুষ, একটি প্রতিষ্ঠান কিংবা একটি সমাজকে ভুল থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করে।
একটি স্কুলের পরীক্ষার খাতার কথা ধরা যাক। একই প্রশ্নের উত্তরে দুই ছাত্র একই ভুল করল। একজন শিক্ষকের নিজের ছেলে, অন্যজন সাধারণ ছাত্র। নিজের ছেলের খাতায় ভুলটি দেখে শিক্ষক হয়তো বললেন, “এবার একটু অসাবধান হয়েছে।” কিন্তু অন্য ছাত্রটির খাতায় একই ভুল দেখে লিখলেন, “পড়াশোনায় মনোযোগ নেই।” ভুলটা দুজনেরই ছিল, অথচ বিচারের ভাষা এক হলো না।
এমন আচরণ শুধু শ্রেণিকক্ষে নয়, পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং নানা প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়। নিজের কাছের মানুষের ভুলকে আমরা অনেক সময় পরিস্থিতি দিয়ে ব্যাখ্যা করি, অথচ অন্যের একই ভুলকে চরিত্রের দোষ বলে ধরে নিই। তখন ন্যায়বিচারের জায়গায় পরিচয় ও সম্পর্ক বড় হয়ে ওঠে।
কোনো সিদ্ধান্ত ভালো হলে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েও তার যুক্তি তুলে ধরা সম্ভব। আর সিদ্ধান্তে ভুল থাকলে প্রশ্নের কারণেই তা সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়। যে ব্যবস্থায় প্রশ্নের জবাব না দিয়ে প্রশ্নকারীকে ছোট করা হয়, সেখানে ভুলগুলো একসময় নিয়মে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্স্বাধীনতার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ১৯ অনুচ্ছেদেও মতামত পোষণ ও প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। এসব অধিকার শুধু কাগজে লেখা কিছু শব্দ নয়। মানুষের মর্যাদা, বিবেক ও স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগের সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক রয়েছে।
একটি সুস্থ সমাজে সবাই একমত হবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। বরং মতের অমিল থাকা সত্ত্বেও পরস্পরের কথা শোনার পরিবেশ তৈরি করাই বেশি জরুরি। কেউ প্রশ্ন করলেই তাকে শত্রু ভাবতে হবে কেন? কেউ ভিন্নমত দিলেই তার উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ করতে হবে কেন?
যে শিক্ষক ছাত্রের প্রশ্ন শুনে উত্তর খোঁজেন, তিনি নিজের মর্যাদা হারান না। যে অভিভাবক সন্তানের ভিন্নমত শোনেন, তাঁর ভালোবাসা কমে যায় না। যে প্রতিষ্ঠান নিজের ভুল স্বীকার করে, তার গ্রহণযোগ্যতা বরং বাড়ে।
সেদিনের সেই ছাত্রটির কথা আবার মনে পড়ে। শিক্ষক যদি তাকে বলতেন, “তোমার প্রশ্নটা ভালো। চলো, আমরা বিষয়টি যাচাই করি”, তাহলে হয়তো ছেলেটি পরের দিন আরও একটি প্রশ্ন নিয়ে ক্লাসে আসত।
কিন্তু সে চুপ করে গিয়েছিল।
একটি শ্রেণিকক্ষে একজন ছাত্রের চুপ করে যাওয়া হয়তো খুব বড় ঘটনা নয়। কিন্তু একটি সমাজের মানুষ যখন একে একে প্রশ্ন করা ছেড়ে দেয়, তখন সেই নীরবতার মূল্য অনেক বেশি হয়ে যায়।
কারণ প্রশ্ন থেমে গেলেও ভুল থেমে থাকে না।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ৩৯; মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র, অনুচ্ছেদ ১৯।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।