অনুভূতির বাণিজ্যিকরণ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। ০৫ মার্চ ২০২৬
“আমি শুনছি”—এই বাক্যটির সামাজিক মূল্য কত?
এখানে মূল্য বলতে অর্থনৈতিক দাম নয়। বোঝানো হচ্ছে সম্পর্কের ভেতরে এর প্রতীকী মর্যাদা। আজকের শহুরে, অনলাইন-নির্ভর মধ্যবিত্ত জীবনে এই বাক্যটি কেবল সহমর্মিতা নয়; এটি একটি সামাজিক মুদ্রা। সামাজিক মাধ্যমে, বন্ধুমহলে, এমনকি কর্মক্ষেত্রেও এই ভাষা আপনাকে ‘সংবেদনশীল’ প্রমাণ করে। অনুপস্থিতি কখনো আপনাকে ‘উদাসীন’ বা ‘দূরত্বপ্রবণ’ মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে।
একটি নির্দিষ্ট দৃশ্য কল্পনা করুন। আপনার এক বন্ধু ফেসবুকে একটি দীর্ঘ পোস্ট দিয়েছেন—কাজের চাপ, মানসিক ক্লান্তি, একাকীত্ব। মন্তব্যের ঘরে দশটি “আমি তোমার পাশে আছি” ভেসে উঠছে। আপনিও লিখলেন, “ভাই, যা কিছু দরকার বলো।” কিন্তু সত্যি কি আপনি সেই রাতে ফোন দিয়েছিলেন? নাকি কেবল প্রত্যাশিত ভাষাটি ব্যবহার করে অন্য কাজে চলে গেলেন?
এই দৃশ্যটি আমাদের সময়ের অনুভূতির বিনিময় অর্থনীতির একটি ছোট নমুনা।
সমাজবিজ্ঞানী আর্লি রাসেল হকশিল্ড সেবাখাত নিয়ে গবেষণা করার সময় ‘আবেগগত শ্রম’ বা অনুভূতি নিয়ন্ত্রণের ধারণা দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, কর্মীরা কেবল কাজ করেন না; তারা নিজেদের আবেগকেও পেশাগত প্রত্যাশা অনুযায়ী সাজিয়ে নেন। হাসি, ধৈর্য, কোমলতা—এসব হয়ে ওঠে চাকরির অংশ। আমরা যখন এই কাঠামোটি ব্যক্তিগত সম্পর্কে প্রয়োগ করি, তখন অনুভূতি ব্যক্তিগত থেকে সামাজিক পণ্যে পরিণত হয়।
এই পণ্যের বিনিময়ে আমরা পাই দৃশ্যমানতা আর সামাজিক স্বীকৃতি।
তবে এই প্রবণতা সম্পূর্ণ নতুন নয়। রাজদরবারে কবির প্রশস্তি বা জমিদার বাড়িতে কবিগান—স্বীকৃতির লড়াই সব যুগেই ছিল। কিন্তু নতুন হলো এর প্রযুক্তিগত তাৎক্ষণিকতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার চাপ। যখন চাকরি অস্থায়ী, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তখন সামাজিক দৃশ্যমানতা নিরাপত্তার একটি অস্ত্র হয়ে ওঠে। আবেগ প্রকাশ তখন কেবল অনুভূতি নয়; নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখার কৌশল হয়ে ওঠে।
এখানেই আমাদের বর্তমান সময়ের একটি বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে। আমরা আর নিজেকে প্রতারণা করি না যে আমরা যা প্রকাশ করছি তা-ই আমাদের অন্তর্থলের কথা। আমরা জানি আমরা প্রকাশ করছি, এবং সেই প্রকাশের পেছনে লুকিয়ে থাকা সামাজিক উদ্দেশ্যটিও আমরা আঁচ করতে পারি। এটি ‘গণনাকৃত সততা’—যেখানে আমরা জানি আমরা অভিনয় করছি, কিন্তু সেই অভিনয়টিকেই বাস্তবের অংশ হিসেবে মেনে নিই।
বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে এই জটিলতা আরও স্তরযুক্ত।
শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কাছে আবেগ এখন ‘সামাজিক মূলধন’। অনলাইনে ভাঙ্গন প্রকাশ বা সমর্থন জানানো—এগুলো একটি নির্দিষ্ট ‘আধুনিক’ পরিচয় বজায় রাখে। কিন্তু গ্রামীণ সমাজের চিত্র ভিন্ন। সেখানে শোকসভা, মিলাদ বা পারিবারিক অনুষ্ঠানে আবেগ প্রকাশের লক্ষ্য হলো ‘সামজিক সংহতি’ বা ‘প্রথা পালন’। গ্রামের মানুষ কাঁদে না শুধু অনুভূতির জন্য নয়, কাঁদে কারণ সেখানে কান্না না করা অসামাজিক বা ‘অপরাধ’ বলে গণ্য হয়। শহরে আবেগ বিক্রি হয় ‘পছন্দ’ বা যোগাযোগের জন্য, গ্রামে তা বিনিময় হয় ‘মর্যাদা’ বা ‘গ্রহণযোগ্যতার’ জন্য। উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও দুই জায়গাতেই আবেগ একটি বাহ্যিক মাস্ক পরে নেয়।
এই বাণিজ্যিকরণের চাপ নারী-পুরুষ উভয়ের ওপরই আলাদা আলাদাভাবে নেমে আসে। নারীদের ক্ষেত্রে এটি ‘সম্পর্ক রক্ষা’ বা ‘যত্ন’—যা সমাজ প্রত্যাশা করে। অন্যদিকে পুরুষদের ক্ষেত্রে এটি ‘দৃঢ়তা’ বা ‘ভেদাভেদ’। পুরুষদের কান্না সংযত রাখতে হয়, দুর্বলতা আড়াল করতে হয়। এটিও এক ধরনের অদৃশ্য শ্রম। কোনো শ্রম বেশি কঠিন তা নির্ণয় করা কঠিন, তবে উভয়ই মানুষকে তার আসল অবস্থান থেকে সরিয়ে এনে একটি সামাজিক ছাঁচে ফেলে দেয়।
আমি নিজেও এই কাঠামোর বাইরে নই।
কোনো বন্ধুর কষ্টের পোস্টে দ্রুত সাড়া দিতে গিয়ে প্রায়ই নিজের মধ্যে প্রশ্ন জাগে—আমি কি সত্যিই শুনছি, নাকি শুধুই প্রত্যাশিত ‘ভালো মানুষ’ হওয়ার ভূমিকায় অভিনয় করছি? উত্তরটি সবসময় স্পষ্ট হয় না। তবে এই প্রশ্নটি জাগানোটাই হয়তো মুক্তির প্রথম ধাপ।
আমরা আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রকাশ করছি, কথা বলছি। দৃশ্যমানতার এই বিস্তার আমাদের আত্মসচেতন করেছে। কিন্তু প্রকৃত সম্পর্কের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জটি অন্য জায়গায়। চ্যালেঞ্জ হলো—কখন অনুভূতি আমাদের ভাষা চালায়, আর কখন ভাষা অনুভূতিকে সাজিয়ে তোলে?
বাণিজ্যিকরণ এবং সামাজিক রীতি এক নয়। সমাজ সবসময়ই আবেগকে নিয়মের মাঝে আবদ্ধ রাখে। কিন্তু বাণিজ্যিকরণ ঘটে যখন অনুভূতি হয়ে ওঠে একটি লেনদেনের মাধ্যম—আমি তোমার কষ্ট দেখলাম, তাই তোমাকে আমার সমর্থন প্রমাণ করতে হবে। এই সীমাটুকু বোঝা এখন সময়ের দাবি।
হয়তো একদিন সামাজিক মাধ্যমের পর্দা নিভবে। পছন্দ আর মন্তব্যের ভিড় থেমে যাবে। তখন যা থাকবে তা হলো—নীরবতা। আর সেই নীরবতাতেই লুকিয়ে থাকবে আমাদের আসল অস্তিত্ব। সেই অন্তর্লীন মানুষটির কাছে ফিরে যাওয়াই হয়তো বাণিজ্যিকতা থেকে মুক্তির একমাত্র পথ। যেখানে কোনো দর্শক নেই, কোনো মূল্য নেই—শুধুই নিঃসঙ্গ ও সত্য একটি হৃদয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।