নিজের জীবন, নিজের ভয়
(নারী, পরিবার ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
২২ অক্টোবর ২০২৬
মেয়েটি পড়াশোনা করতে চেয়েছিল, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছিল, হয়তো নিজের পছন্দের একটি জীবনও চেয়েছিল। কিন্তু একসময় সে নিজেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করল, ‘আমি যা চাই, তা কি সত্যিই চাওয়ার অধিকার আমার আছে?’
ছোটবেলা থেকে সে শুনেছে, ভালো মেয়েরা পরিবারের কথা ভাবে। বড় হওয়ার পর শুনেছে, বয়স থাকতে বিয়ে করতে হয়। বিয়ের পর প্রশ্ন এসেছে, সন্তান কবে হবে। সন্তান হওয়ার পর বলা হয়েছে, নিজের কথা পরে ভেবো, এখন বাচ্চার ভবিষ্যৎটাই আগে।
সবার প্রত্যাশা পূরণ করতে করতে একসময় সে বুঝতে পারল, নিজের চাওয়াগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। পরিবারের কে কী চায়, কার কোন কথায় মন খারাপ হয়, কী করলে সবাই খুশি থাকে—এসব সে জানে। অথচ নিজের কাছে জানতে চাইলে, সে আসলে কী চায়, উত্তর দিতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়।
বয়সের হিসাব, জীবনের হিসাব
আমাদের সমাজে মেয়েদের জীবনের জন্য কিছু অলিখিত সময়সীমা তৈরি করা আছে। নির্দিষ্ট বয়সে পড়াশোনা শেষ করতে হবে, চাকরি পেতে হবে, বিয়ে করতে হবে, তারপর সন্তান নিতে হবে। একটু এদিক-ওদিক হলেই প্রশ্ন শুরু হয়।
“এখনো বিয়ে করছ না কেন?”
“সংসার করবে কখন?”
“সন্তান নেওয়ার কথা ভাবছ না?”
প্রশ্নগুলো স্বাভাবিক কথাবার্তার মতো শোনালেও বারবার শুনতে শুনতে একজন নারী নিজের ইচ্ছার চেয়ে অন্যের প্রত্যাশাকে বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন। তিনি ভাবেন না, বিয়েতে তাঁর মন সায় দিচ্ছে কি না; ভাবেন, দেরি হলে মানুষ কী বলবে। সন্তান নেওয়ার জন্য তিনি প্রস্তুত কি না, সেই প্রশ্নের আগেই মনে আসে, পরিবারকে আর কত দিন অপেক্ষা করাবেন।
অথচ সবার জীবনের সময়সূচি এক নয়। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া মানেই পিছিয়ে পড়া নয়। কিন্তু সমাজের চোখে গ্রহণযোগ্য হওয়ার চাপে অনেক নারী নিজের পছন্দকেই সন্দেহ করতে শুরু করেন।
পরিবারকে কষ্ট দেওয়ার ভয়
মেয়েটির সবচেয়ে বড় দ্বিধা হয়তো সমাজকে নিয়ে নয়, নিজের পরিবারকে নিয়ে।
একবার সে অন্য শহরে চাকরির সুযোগ পেয়েছিল। কাজটা তার পছন্দের, নিজের পায়ে দাঁড়ানোরও সুযোগ। খবরটা মাকে জানাতেই মা বললেন, “তুই চলে গেলে আমরা এখানে একা কীভাবে থাকব?”
মেয়েটি চুপ করে গেল। সে জানত, মা তাকে ভালোবাসেন। কিন্তু মায়ের কথার পর নিজের স্বপ্নের দিকে এগোনোটা তার কাছে স্বার্থপরতার মতো মনে হলো। শেষ পর্যন্ত চাকরির আবেদনটা আর এগোল না।
কোথাও ঝগড়া হয়নি, কেউ সরাসরি নিষেধও করেনি। শুধু একজন মা নিজের ভয় প্রকাশ করেছেন, আর একজন মেয়ে সেই ভয়কে নিজের সিদ্ধান্তের ওপর বসিয়ে দিয়েছে।
এমন অনেক সিদ্ধান্তের কোনো সাক্ষী থাকে না। মেয়েটি হয়তো অন্যদের বলে, “আমি নিজেই যাইনি।” কিন্তু কেন যায়নি, সেই উত্তরটি সে নিজেকেও সব সময় বলতে পারে না।
বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ববোধ থাকা স্বাভাবিক। তাঁদের অনুভূতিও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাঁদের ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সব সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিতে হবে, এমন নয়। কোনো বিষয়ে অসম্মতি জানানো মানেই তাঁদের অবদান অস্বীকার করা নয়।
তবু অনেক মেয়ের মনে হয়, নিজের জন্য কিছু চাইলে কাউকে না কাউকে কষ্ট পেতেই হবে, আর সেই কষ্টের দায় তাঁদেরই নিতে হবে।
নিজের ইচ্ছাও একসময় অচেনা লাগে
বছরের পর বছর অন্যের প্রয়োজনকে আগে রাখতে রাখতে একজন নারী একসময় নিজের চাওয়াকেই চিনতে পারেন না। কেউ জিজ্ঞেস করলে, “তুমি কী করতে চাও?”—তিনি প্রথমেই ভাবেন, পরিবার কোন উত্তরটি মেনে নেবে।
নিজের ইচ্ছা মনে এলেও সঙ্গে সঙ্গে ভাবেন, এতে কারও মন খারাপ হবে কি না, মানুষ তাঁকে স্বার্থপর বলবে কি না। ধীরে ধীরে নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করার আগেই তিনি তার বিরুদ্ধে যুক্তি খুঁজে বের করেন।
সে কারও মেয়ে, কারও স্ত্রী, কারও মা—এই পরিচয়গুলো তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এগুলোর বাইরেও সে একজন স্বতন্ত্র মানুষ। তার পছন্দ আছে, আগ্রহ আছে, নিজের মতো করে কিছু করার ইচ্ছা আছে। সেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া মানে পরিবারকে ছোট করা নয়।
নিজের পরিচয় ফিরে পেতে সব সম্পর্ক ছেড়ে চলে যেতে হয় না। কখনো শুরুটা হতে পারে অসমাপ্ত পড়াশোনা আবার শুরু করা, নিজের পছন্দের কাজে সময় দেওয়া কিংবা বহুদিনের কোনো স্বপ্ন নিয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলা থেকে।
পরিবারের ভেতরেও নিজের জায়গা
স্বাধীনতা মানেই পরিবার থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। একজন নারী বাবা-মায়ের পাশে থেকেও নিজের পেশা বেছে নিতে পারেন, সংসারের দায়িত্ব পালন করেও নিজের জন্য সময় চাইতে পারেন। সম্পর্ক বজায় রাখা আর পরিবারের প্রত্যাশার কাছে নিজের সব ইচ্ছা সমর্পণ করা এক নয়।
পরিবারকেও বুঝতে হবে, মেয়ের সিদ্ধান্ত সব সময় তাঁদের পছন্দের সঙ্গে মিলবে না। সেই অমিলকে অবাধ্যতা না ভেবে একজন স্বতন্ত্র মানুষের অধিকার হিসেবে মেনে নেওয়া জরুরি।
মেয়েটি হয়তো একদিন আবার কোনো চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে থামবে। কাজটা তার ভালো লাগবে। অন্য শহরে থাকতে হতে পারে, মায়ের একা লাগতে পারে, আত্মীয়রা প্রশ্নও করতে পারেন। ভয়গুলো এবারও থাকবে।
তবু সে মাকে ফোন করে বলবে, “মা, একটা কাজের সুযোগ পেয়েছি। আমি চেষ্টা করে দেখতে চাই।”
ওপাশ থেকে মা কী বলবেন, সে জানে না। ফোন রেখে মেয়েটি আবার বিজ্ঞাপনটির দিকে তাকাবে। আবেদন করার বোতামটা তখনো পর্দায় জ্বলছে।
এবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সে শুধু মায়ের কথা ভাববে না। নিজের কথাটাও ভাববে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।