গল্প আছে, সাহিত্যে নেই
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ১২ জুন, ২০২৬
চারপাশে গল্পের কমতি নেই। তবু সাহিত্যের পাতা ওল্টালে সেই গল্পগুলোর দেখা মেলে কই?
কথাটা মাথায় ঘুরপাক খায়। প্রায়ই।
সকালের কাগজে চোখ রাখলেই টের পাওয়া যায়। মিরপুরের এক গ্যারেজে দশ বছরের শফিক কালি মাখা হাতে ভাতের থালায় বসে। স্কুলের নাম সে কেবল সাইনবোর্ডে দেখেছে। পিজি হাসপাতালের বহির্বিভাগে রহিমা বেগমের হাতে ভাঁজ পড়া টিকিট। ছয় দিন হলো ডাক্তার দেখাতে পারেননি। উত্তরার এক ফ্ল্যাট নিয়ে সন্ধ্যায় গুজব ছড়াল। ‘বাড়িওয়ালা ছেলেধরা’। রাত নামার আগেই পরিবারটা সুটকেস গুছিয়ে ফেলল। আবার কাঁটাবনের মোড়ে রাসেল দাঁড়িয়ে হিসাব কষে। ৭০০ টাকা হলেই ৪৫তম বিসিএসের ফরম তোলা যায়। পকেটে আছে ২৬০।
এগুলোই গল্প। এবং আমার ধারণা, সবচেয়ে জরুরি গল্প।
কিন্তু সাহিত্যের দিকে তাকালে মনে হতে পারে, এই মানুষগুলো কোনো অদৃশ্য ফাঁক গলে পড়ে যাচ্ছে।
বলছি না যে কেউ লিখছেন না। ইলিয়াসের পরে শাহাদুজ্জামানের ‘ক্রাচের কর্নেল’ কিংবা হারুন হাবীবের কোনো কোনো গল্পে সময়ের আঁচ লাগে। তবু সামগ্রিক ছবিটা দেখলে অস্বস্তি হয়। আমাদের কালের যে ক্ষতগুলো রোজ সকালে ব্যান্ডেজ ছাড়াই রাস্তায় নামে, সাহিত্যে তার দাগ কি ততটা গাঢ়?
এর একটা কারণ হয়তো আরাম। নিরাপদ বিষয়ে কলম চলে সহজে।
প্রেম নিয়ে লিখলে কেউ মানহানির মামলা করে না। নিজের ছেলেবেলার পদ্মপুকুর নিয়ে লিখলে পাঠক চোখ মোছেন। এগুলো লেখা যাবে না, তা নয়। সমস্যাটা বাঁধে তখন, যখন প্রায় সব লেখাই একই উঠানে হাঁটে। তখন যে প্রশ্নগুলো আমাদের ঘুম কামড়ে ধরে, সেগুলো পাণ্ডুলিপির বাইরে থেকে যায়।
ওখানে ঝামেলা কম। কেউ তেড়ে আসবে না। কাউকে অস্বস্তিতে ফেলার ভয় নেই। ফলে আমরা এমন গল্প বাছি যা পড়ে আরাম লাগে, অথচ আয়নার সামনে দাঁড় করায় না।
অথচ সাহিত্যের কাজ তো ধাক্কা দেওয়া।
‘চিলেকোঠার সেপাই’ তার সময়ের দমবন্ধ অবস্থাকে পাশ কাটায়নি। ‘গণদেবতা’য় আকাল এসেছে খালি পায়ে। লেখকেরা চোখ ফিরিয়ে নেননি। কারণ সাহিত্য শুধু বানিয়ে তোলা জগত না। এটা একটা সমাজ কীভাবে হাঁটল, কোথায় উষ্টা খেল, কীভাবে সেলাই নিয়ে আবার উঠে দাঁড়াল, তার হিসাব।
আজকের দিন কি কম জটিল? মনে হয় না।
আমাদের সবার হাতে একটা করে স্ক্রিন। সেটা সম্পর্ক বদলায়, মনোযোগ কাটে। মগবাজারের রফিক সাহেব গত মাসে চাকরি হারালেন। সামনে ইএমআই, ছেলের স্কুলের বেতন, বাসা ভাড়া। থেরাপিস্টের কথা উঠলেই আমরা হেসে ফেলি। ‘আমি কি পাগল?’ ফলাফল, আমরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কানেক্টেড, কিন্তু রাত দুটোয় মেসেঞ্জারের নীল আলোয় একা।
এই বাস্তবতাগুলো সাহিত্যে কতটা আসছে?
আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি না। পাঠক হিসেবে পড়তে গিয়ে মাঝে মাঝে মনে হয়, যথেষ্ট না।
অনেক উপন্যাসে এমন সব চরিত্র মেলে যাদের বসার ঘরটা অসম্ভব পরিপাটি। তাদেরও যন্ত্রণা আছে। কিন্তু সেই যন্ত্রণার সাথে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার ইন্টারভিউর আগের রাতটা মেলে না। বই শেষ হয়। ভালোও লাগে। তবু কোথায় যেন একটা দূরত্ব রয়ে যায়।
কারণ পাঠক তখনই নড়ে ওঠেন, যখন পাতার ভেতর নিজের হাতের রেখা দেখতে পান।
সত্যি বলতে, বাস্তবতা নিয়ে লেখা সহজ না। সত্যের গায়ে সবসময় আতরের গন্ধ থাকে না। সেখানে অন্যায়ের ঝাঁজ আছে। বঞ্চনার কালি আছে। লিখতে গেলে নিজেকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড়াতে হয়।
সেই অস্বস্তি এড়িয়ে গেলে সাহিত্য নিরাপদ হয়। তবে একই সাথে দূরেরও হয়ে যায়।
আমার কাছে মনে হয়, সাহিত্যের কাজ কেবল বাক্যের কারুকাজ না। এর কাজ হলো সেই মানুষটার পাশে গিয়ে বসা যাকে আমরা রোজ দেখি, কিন্তু যার কথা শুনি না।
গার্মেন্টস থেকে ফিরে যে মেয়েটা পায়ের ফোস্কায় মলম লাগায়। সিভি ফটোকপি করতে গিয়ে যার শেষ বিশ টাকা ফুরিয়ে যায়। কলাবাগানের যে দাদুটা এখন বিকেলে ছাদে একা চা খান আর পুরোনো চিঠি পড়েন। ইটভাটায় যে বাচ্চাটার তালুতে ফোসকা পড়ে।
এই টেনশনগুলোই বলে দেয়, এরা কেউ দৃশ্যের বাইরের লোক না। এরাই সময়।
হ্যাঁ, সাহিত্যে প্রেম থাকবে। রহস্য থাকবে। জাদুবাস্তবতাও থাকুক। কিন্তু তার সাথে রাস্তার ধুলোটাও থাকা দরকার। কারণ আমরা কেবল স্বপ্নে বাঁচি না। আমরা বাজারে দামাদামি করি। বৃষ্টিতে বাস মিস করি। রিপোর্ট হাতে নিয়ে ডাক্তারের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি।
আসলে কথাগুলো আমি অন্যদের শোনাচ্ছি না শুধু। নিজেকেও। লিখতে বসলেই টের পাই, কঠিন গল্পের সামনে আঙুল কাঁপে। সহজ গল্পের নরম বিছানায় গা এলিয়ে দিতে ইচ্ছে করে।
তাই প্রশ্নটা ফিরে আসে। বারবার।
চারপাশে এত মুখ, এত ঘটনা। তার কতটুকু আমরা কাগজে তুলতে পারছি?
গল্পের অভাব আছে বলে মনে হয় না। গল্প ফুটপাতে শুয়ে আছে। বাসের হাতলে ঝুলছে। বিকাশের দোকানের লাইনে দাঁড়িয়ে ঘামছে।
কমতি যদি থাকে, সেটা আমাদের দেখার। আমরা কতটা মন দিয়ে তাকাচ্ছি, সেটাই আসল কথা।
আপনার চোখে, আজকের বাংলাদেশের কোন চাপা দীর্ঘশ্বাসটা সাহিত্যে আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।