দেবদাসের ভেতরের নারীবাদ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১১ মার্চ ২০২৬
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবদাস—এটিকে কি সত্যিই শুধু মিলনহীন প্রেমের গল্প বলেই মেনে নেওয়া যায়? আমরা অনেকেই উপন্যাসটিকে ব্যর্থ প্রেমের করুণ কাহিনি হিসেবে পড়ে অভ্যস্ত। চোখে পড়ে দেবদাসের আত্মবিনাশ, পার্বতীর অপূর্ণতা, চন্দ্রমুখীর নিঃস্বার্থতা। তবু কোথাও যেন মনে হয়, এই পাঠে কিছু বাদ পড়ে যাচ্ছে। উপন্যাসটি সম্ভবত আরও জটিল—ঔপনিবেশিক বাংলার পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারী ও পুরুষের নৈতিক অবস্থানকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দেখার একটি সূক্ষ্ম প্রচেষ্টা। এখানে একটি ঝুঁকিপূর্ণ দাবি করা যায়। দেবদাস সরাসরি নারীমুক্তির পক্ষে লেখা নয়—এ কথা বলা নিরাপদ। কিন্তু একই সঙ্গে বলা যায়, নারীচরিত্রগুলির নৈতিক স্থিতি বারবার পুরুষ চরিত্রকে ছাপিয়ে যায়। অন্তত পাঠের ভেতর থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ঔপনিবেশিক ভদ্রলোকের দ্বিধা
উনিশ শতকের শেষভাগে বাংলায় যে শিক্ষিত ভদ্রলোক সমাজ গড়ে উঠছিল, তা ছিল দ্বৈততার ওপর দাঁড়ানো। ইংরেজি শিক্ষায় আলোকিত, কিন্তু পারিবারিক রীতিতে অনমনীয়। আধুনিকতার ভাষা জানা, অথচ সিদ্ধান্তে রক্ষণশীল। দেবদাস যেন এই মানসিক অবস্থারই প্রতিনিধি। সে ভালোবাসে—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু ভালোবাসার সামাজিক পরিণতি বহন করতে সে প্রস্তুত নয়। পারিবারিক সম্মান, বংশগৌরব, সামাজিক রীতি—এসব তার ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর অদৃশ্য চাপ তৈরি করে। ফলে তার দ্বিধা কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; সম্ভবত শ্রেণিগত অভ্যাসেরও ফল। এই দ্বিধা তাকে করুণ করে তোলে। কিন্তু করুণ হওয়া আর নায়ক হওয়া এক জিনিস নয়।
পার্বতী: আত্মত্যাগের আড়ালে স্থিতি
পার্বতীকে দীর্ঘদিন ধরে আত্মত্যাগী প্রেমিকার আদর্শে বসানো হয়েছে। কিন্তু পাঠ একটু ধীর করলে দেখা যায়, সে একেবারেই নিষ্ক্রিয় নয়। বরং সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে সে নিজেই পদক্ষেপ করে। রাতের অন্ধকারে দেবদাসের কাছে যাওয়ার দৃশ্যটি—সময়ের সামাজিক নিয়ম বিবেচনায়—সাহসেরই ইঙ্গিত দেয়। সে অপেক্ষা করে না, দাবি জানায় না উচ্চকণ্ঠে, কিন্তু নিজের উপস্থিতি অস্বীকারও করে না। দেবদাস যখন অনিশ্চয়তার আড়ালে সরে যায়, পার্বতী সেখানে ভেঙে পড়ে স্থির হয়ে থাকে না। তার বিয়ের সিদ্ধান্তকে একমাত্র সামাজিক চাপের ফল বলা সহজ, কিন্তু অসম্পূর্ণ। প্রত্যাখ্যাত প্রেমের পরে আত্মবিনাশের পথ সে নেয় না; বরং নিজেকে স্থিত অবস্থায় রাখে। এটি নিছক আত্মসমর্পণ নয়। সিমোন দ্য বোভোয়ার যে ‘অন্য’ অবস্থানের কথা বলেছিলেন, পার্বতী যেন সেখান থেকেই শুরু করে।
চন্দ্রমুখী: প্রান্তিকতার পুনর্নির্মাণ
চন্দ্রমুখী আলাদা করে ভাবতে হবে। সমাজ তাকে নাম দেয়, স্থান দেয়, সীমা বেঁধে দেয়। কিন্তু শরৎচন্দ্র তার ভেতরে অন্য এক সুর খুঁজেছেন। দেবদাসের আত্মবিধ্বংসী জীবনের পাশে যে চরিত্রটি সবচেয়ে স্থিরভাবে দাঁড়ায়, সে এই তথাকথিত প্রান্তিক নারী। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—চন্দ্রমুখীর রূপান্তর কোনো পুরুষের স্বীকৃতির ওপর দাঁড়ানো নয়। দেবদাস তাকে মর্যাদা দেয় না, তবু সে নিজের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনে। এটি প্রেমের ফল, নাকি আত্মসম্মানের—নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তার জীবনযাপনই তার ভাষা হয়ে ওঠে।
দেবদাস: করুণতা বনাম দায়িত্ব
দেবদাসকে বহু পাঠে এক মহৎ প্রেমিক হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু তার আচরণে একধরনের এড়িয়ে যাওয়া স্পষ্ট। পার্বতী সম্পর্কের দায় নিতে প্রস্তুত; দেবদাস সরে যায়। পরে তার মদ্যপান, আত্মবিনাশ—এসবকে প্রায়শই রোমান্টিক করা হয়েছে। অথচ এগুলো ব্যর্থতার অন্য নামও হতে পারে। সে অনুভব করে, কিন্তু স্থির হয় না। ভালোবাসে, কিন্তু সিদ্ধান্তে পৌঁছায় না। তার কষ্ট সত্যি, কিন্তু সেই কষ্টকে কর্মে রূপ দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। ফলে তার ট্র্যাজেডি ব্যক্তিগত দুর্বলতার সঙ্গেও জড়িত।
নীরবতার রাজনীতি
উপন্যাসে কোনো প্রকাশ্য নারীবাদী ঘোষণা নেই। স্লোগানও নেই। তবু একটি নীরব সঞ্চালন চোখে পড়ে—যেখানে সামাজিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত পুরুষ চরিত্র নৈতিকভাবে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, আর সামাজিকভাবে সীমাবদ্ধ নারীরা স্থিত থাকে। দেবদাস ভেঙে যায়। পার্বতী নিজেকে সামলে নেয়। চন্দ্রমুখী নিজের অবস্থান নতুনভাবে গড়ে তোলে। এই বিন্যাস ইঙ্গিত করে, ক্ষমতার কাঠামো আর নৈতিক শক্তি একই জায়গায় অবস্থান করে না।
দেবদাসকে কেবল রোমান্টিক ট্র্যাজেডি হিসেবে পড়লে উপন্যাসের একটি দিক ধরা পড়ে, সবটা নয়। এটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নৈতিক অবস্থানের পুনর্বিবেচনার সুযোগ দেয়। সামাজিক সুবিধা পুরুষের হাতে থাকতে পারে, কিন্তু নৈতিক স্থিতি কোথায়—এই প্রশ্নটি খোলা থাকে। দেবদাসের ভেতরের নারীবাদ উচ্চকণ্ঠ নয়। এটি ঘোষণাপত্রও নয়। বরং এক ধরনের নীরব অতিক্রমণ—যা চোখে পড়ে তখনই, যখন আমরা প্রেমের গল্পের আড়ালে চরিত্রগুলোর ভঙ্গুরতা ও স্থিতিকে পাশাপাশি রাখি।
#দেবদাসেরভেতরেরনারীবাদ #শরৎচন্দ্র #নারীবাদ #বাংলাসাহিত্য #সাহিত্যসমালোচনা #পার্বতী #চন্দ্রমুখী #নারীপাঠ #বাংলাউপন্যাস
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।