কুসংস্কার অশিক্ষা না মানুষের গভীর মনস্তত্ত্ব মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন, প্রাবন্ধিক নিবন্ধ। এপ্রিল ১০, ২০২৬ রাত অনেক হয়েছে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। শহরের ফ্ল্যাট, তবুও চারপাশটা অচেনা লাগতে শুরু করে। বারান্দার দিকে তাকালে অন্ধকারটা স্বাভাবিকের চেয়ে ঘন ঠেকে। আপনি জানেন—এখানে কোনো অস্বাভাবিক কিছু নেই। তবুও শরীরটা একটু সজাগ হয়ে ওঠে। যেন শরীরই আগে জানে। এই ছোট অভিজ্ঞতাটাই প্রশ্ন তোলে—শিক্ষিত মানুষও এমন মুহূর্তে অকারণে এমন সাড়া দেয় কেন? আমরা সহজ উত্তর পছন্দ করি। কুসংস্কার মানেই অশিক্ষা—এই ধারণাটা তাই বেশ স্বস্তিদায়ক। এতে বিষয়টা পরিষ্কার থাকে: শিক্ষা বাড়লে কুসংস্কার কমবে। কিন্তু অভিজ্ঞতা অন্য কথা বলে। একই মানুষ, যে যুক্তি দিয়ে সব ব্যাখ্যা করতে চায়, সে-ই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে হঠাৎ অদ্ভুত কিছু বিশ্বাস করতে শুরু করে। দিনের বেলায় যা অস্বীকার করে, রাতে সেটাকেই এড়িয়ে চলে। এখানেই বোঝা যায়, বিষয়টা কেবল তথ্যের অভাব না। মানুষের মস্তিষ্ক অনিশ্চয়তা সহ্য করতে পারে না—এটা প্রায় প্রাথমিক সত্য। আমরা প্রতিটি ঘটনার কারণ জানতে চাই। কিন্তু সবকিছুর ব্যাখ্যা মেলে না। কিছু ঘটনা হঠাৎ ঘটে, কিছু ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই ফাঁকটাই সমস্যার জায়গা। মস্তিষ্ক সেই ফাঁক খালি রাখে না; দ্রুত কোনো ব্যাখ্যা বসিয়ে দেয়, সেটি দুর্বল হলেও। কুসংস্কার সেই তাড়াহুড়ো করে বসানো ব্যাখ্যাগুলোর একটি। একটা দৃশ্য ধরা যাক। গ্রামে টিনের ঘর। রাতে হালকা বৃষ্টি হয়েছে। হঠাৎ ছাদের ওপর টুপ করে শব্দ হল। আপনি জানেন—জল পড়েছে, বা শুকনো ডাল। তবুও কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হয়, অন্য কিছু? এই ‘অন্য কিছু’ ভাবনাটা কোথা থেকে আসে? কারণ মস্তিষ্ক শুধু ব্যাখ্যা খোঁজে না, ঝুঁকিও হিসাব করে। এই প্রবণতার শিকড় পুরোনো—যখন অজানাকে দ্রুত হুমকি হিসেবে ধরা বেঁচে থাকার জন্য দরকার ছিল। ফলে অল্প সন্দেহও গুরুত্ব পায়। এখানেই কুসংস্কারের সঙ্গে বিবর্তনীয় ভয়-এর যোগ তৈরি হয়। একদিকে ব্যাখ্যার অভাব, অন্যদিকে অতিরিক্ত সতর্কতা—দুটো মিলে একটি মানসিক শর্টকাট তৈরি করে। তবে এটুকু বললে ছবিটা পুরো হয় না। আরেকটি স্তর আছে—নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। আমরা যা বুঝি না, সেটাকে অন্তত মানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই। এই চেষ্টাটা খুব সূক্ষ্ম। কেউ দরজার পাশে লোহা রাখে, কেউ নির্দিষ্ট দিনে কিছু এড়িয়ে চলে, কেউ নির্দিষ্ট শব্দে গা ছমছম অনুভব করে। এগুলো বাস্তব পরিবর্তন করে না। কিন্তু মনে হয়, কিছু একটা করা হচ্ছে। এই অনুভূতিটাই গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্য এই জায়গাটাকে খুব নিখুঁতভাবে ধরেছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ‘তারানাথ তান্ত্রিক’-এর গল্পগুলোতে বারবার দেখা যায়—ঘটনা এমনভাবে সাজানো, যেখানে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। সবকিছু ব্যাখ্যা করা সম্ভব, আবার পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়াও কঠিন। পাঠক মাঝখানে আটকে থাকে। এই আটকে থাকা—এই অনির্ধারিত অবস্থাটাই আসল খেলা। মানুষ প্যাটার্ন খোঁজে। এটা আমাদের স্বাভাবিক প্রবণতা। দুটো ঘটনা পাশাপাশি ঘটলেই আমরা তাদের মধ্যে সম্পর্ক কল্পনা করি। অনেক সময় তা সত্যি হয় না, তবুও অভ্যাসটা যায় না। ধরা যাক, একদিন অকারণে খারাপ কিছু ঘটল। তারপর থেকে সেই দিনটাকে আলাদা চোখে দেখা শুরু হলো। যুক্তি দিয়ে জানি—এটা কাকতালীয়। তবুও ভেতরে একটা খচখচানি থেকে যায়। কারণ বিষয়টা তখন আর তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সেটা অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে যায়। এই জায়গায় এসে কুসংস্কার বাইরের কিছু নয়। এটা ভেতরের প্রতিক্রিয়া। আমরা নিজেরাই সেটাকে তৈরি করি, আবার নিজেরাই সেটাকে টিকিয়ে রাখি। তাহলে কুসংস্কার কি অশিক্ষার ফল? আংশিকভাবে, হ্যাঁ। কিন্তু এটুকু বললে ভুল হবে। কারণ শিক্ষা বাড়লেও এই প্রবণতা পুরোপুরি মুছে যায় না। বরং তা আড়ালে চলে যায়, রূপ বদলায়। এখানেই একটা অস্বস্তিকর সত্যি সামনে আসে—আমরা যতটা যুক্তিবাদী ভাবি, আসলে ততটা নই। আমি অন্তত নই। সব ব্যাখ্যা জানা থাকার পরও, অমাবস্যার রাতে ছাদের একদম কোণায় গিয়ে দাঁড়ালে পা সরে না। কুসংস্কার ঠিক এই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকে—যেখানে যুক্তি পুরোপুরি জেতে না, অনুভূতিও হার মানে না। আমরা কি সত্যিই সেটাকে অস্বীকার করি? নাকি অস্বীকার করার ভান করি, আর প্রয়োজনমতো আবার তার কাছেই ফিরে যাই? শেষ পর্যন্ত, প্রশ্নটা আর তাত্ত্বিক থাকে না। সত্যি করে বলুন—আপনারও কি এমন একটা রাত আছে, যেটা যুক্তি দিয়ে ঢাকেন, কিন্তু ভয় দিয়ে মানেন?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।