অন্যায়ের পবিত্র নাম
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ২৭ অক্টোবর ২০২৬
একটি পরিবারে মেয়েরা সব সময় সবার শেষে খেতে বসে। পুরুষেরা খাওয়া শেষ করলে হাঁড়িতে যা থাকে, তা দিয়েই তাদের চলতে হয়। দাদি এভাবেই সংসার করেছেন, তাঁর মাও করেছেন। তাই নিয়মটি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেননি। একদিন বাড়ির নতুন বউ বলল, ‘সবাই একসঙ্গে খেতে বসলে সমস্যা কোথায়?’
ঘরে কয়েকজন বিরক্ত হলেন। একজন বললেন, ‘আমাদের বাড়িতে এসব কখনো হয়নি।’ আরেকজন বললেন, ‘এত বছরের নিয়ম, নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো কারণ আছে।’
কেউ কারণটা জানতেন না। তবু নিয়মটা ভাঙতে রাজি ছিলেন না।
সমাজে অনেক অন্যায় এভাবেই টিকে থাকে। প্রথমে কোনো সুবিধার জন্য একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়, পরে মানুষ তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। একসময় অভ্যাসের নাম হয় রীতি, আর রীতির গায়ে জড়িয়ে যায় সম্মানের আবরণ। তখন কেউ প্রশ্ন তুললে মনে হয়, সে শুধু একটি নিয়ম নয়, পূর্বপুরুষদেরও অসম্মান করছে।
যে ভণ্ডামিকে এক প্রজন্ম প্রশ্রয় দেয়, পরবর্তী প্রজন্ম অনেক সময় তাকেই পবিত্র প্রথা বা সংস্কার বলে মেনে নেয়।
অভ্যাসের আড়ালে অন্যায়
একটি পরিবার মেয়ের বিয়েতে সামর্থ্যের বাইরে খরচ করল। লোকলজ্জার ভয়ে বাবা ঋণ করলেন, সঞ্চয় ভাঙলেন। পরের প্রজন্মে সেই বিয়ের গল্প বলা হলো গর্বের সঙ্গে। বলা হলো, ‘আমাদের পরিবারে মেয়েদের বিয়ে সব সময় ধুমধাম করে হয়।’
কিন্তু সেই আয়োজনের জন্য বাবাকে কতটা মূল্য দিতে হয়েছিল, সে কথা আর বলা হলো না। পরের মেয়েটি সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট আয়োজন করতে চাইলে প্রশ্ন উঠল, ‘মানুষ কী বলবে?’
প্রথম প্রজন্ম লোকলজ্জার ভয়ে নিয়ম মেনেছিল। দ্বিতীয় প্রজন্ম সেটাকে ঐতিহ্য ভেবেছে। তৃতীয় প্রজন্ম হয়তো জানেই না, এই নিয়মের পেছনে ভয়ের ইতিহাস ছিল।
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে বলেই কোনো আচরণ ন্যায়সংগত হয়ে যায় না। কিন্তু পরিচিতির প্রতি আমাদের টান এত বেশি যে, পুরোনো নিয়মের যৌক্তিকতা যাচাই করার প্রয়োজনই অনেক সময় অনুভব করি না।
অন্যায়ের পক্ষেও যুক্তি থাকে
অন্যায় টিকিয়ে রাখার জন্য সব সময় খারাপ মানুষের প্রয়োজন হয় না। ভালো মানুষও নিজের সুবিধা, ভয় কিংবা সামাজিক অবস্থান রক্ষার জন্য অন্যায় ব্যবস্থার পাশে দাঁড়াতে পারেন।
সম্পত্তি ভাগের সময় কেউ হয়তো বলেন, ‘মেয়েরা তো বিয়ের পর অন্যের সংসারে চলে যায়।’ কথাটি এতবার বলা হয়েছে যে, একসময় সেটি যুক্তি বলে মনে হয়।
বিয়ে ঠিকানা বদলায়, অধিকার মুছে দেয় না।
এখানেই আত্মপ্রবঞ্চনার শুরু। যে নিয়মে নিজের সুবিধা অক্ষুণ্ন থাকে, মানুষ অনেক সময় সেটাকেই সঠিক বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। তখন অন্যায়কে বাইরে থেকে রক্ষা করতে হয় না; মানুষ নিজের বিবেক দিয়েই তাকে পাহারা দেয়।
প্রশ্ন করাটাই অপরাধ
কোনো প্রথা যত পুরোনো হয়, তাকে প্রশ্ন করা তত কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কারণ প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে যায় পরিবারের সম্মান, বড়দের মর্যাদা কিংবা সমাজে গ্রহণযোগ্য থাকার ভয়।
কোনো মেয়ে যৌতুক দিতে অস্বীকার করলে তাকে পরিবারের রীতি ভাঙার অভিযোগ শুনতে হয়। কোনো ছেলে অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করলে বলা হয়, সে বড়দের সম্মান করতে শেখেনি। ফলে অনেকে প্রতিবাদ করার আগেই থেমে যান।
এই নীরবতা সব সময় সম্মতি নয়। কখনো তা অসহায়তার ফল। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম যখন সেই নীরবতার ইতিহাস জানে না, তখন তারা শুধু দেখে—সবাই নিয়মটি মেনে চলছে। সুতরাং নিয়মটি নিশ্চয়ই ঠিক।
এক প্রজন্মের ভয় আরেক প্রজন্মের বিশ্বাস হয়ে ওঠে।
সব পুরোনো প্রথাই কি ভুল?
না। অনেক ঐতিহ্য মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহযোগিতা ও পারিবারিক বন্ধন ধরে রাখে। সমস্যা প্রথার বয়সে নয়, তার প্রভাবে।
যে রীতি মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে, অধিকার কেড়ে নেয় কিংবা প্রশ্ন করার স্বাধীনতা বন্ধ করে দেয়, তার পবিত্রতার দাবিটি যাচাই করা দরকার। সংস্কৃতি কোনো স্থির বস্তু নয়। মানুষের জীবন বদলায়, অভিজ্ঞতা বদলায়। সংস্কৃতিরও নিজের ভুল সংশোধন করার সুযোগ থাকা উচিত।
পরিবর্তন শুরু হতে পারে একটি সাধারণ প্রশ্ন দিয়ে—‘আমরা এটা করি কেন?’
উত্তর যদি হয়, ‘সবাই করে’, তাহলে আলোচনা শেষ নয়, বরং শুরু হওয়া উচিত সেখান থেকেই। কারা এই নিয়মে সুবিধা পাচ্ছে, কারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আজও এটি ন্যায্য কি না—সেগুলো দেখা দরকার।
পরিবারে ছেলে-মেয়ের অধিকারকে সমান গুরুত্ব দেওয়া, সামর্থ্যের বাইরে বিয়ের খরচ না করা, ছোটদের আপত্তি মন দিয়ে শোনা কিংবা শুধু বড়দের সিদ্ধান্ত বলে অন্যায় মেনে না নেওয়া—এসব পরিবর্তনের জন্য বড় কোনো আন্দোলনের অপেক্ষা করতে হয় না।
উত্তরাধিকারটি কী রেখে যাব?
আমরা সন্তানদের জমি, বাড়ি কিংবা অর্থ দিয়ে যাই। তার সঙ্গে কিছু বিশ্বাসও দিয়ে যাই—কোন প্রশ্ন করা যাবে, কার কথা মানতে হবে, কোন নিয়ম নিয়ে মুখ খোলা নিষেধ।
সন্তানকে শুধু ‘আমাদের পরিবারে এমনটাই চলে আসছে’ বললে তাকে একটি নিয়ম শেখানো হয়। কিন্তু নিয়মটি ন্যায্য কি না, অন্য কারও ক্ষতি হচ্ছে কি না, তা ভাবতে শেখালে তাকে নিজের বিবেক ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়।
হয়তো একদিন আমাদের সন্তান এমন একটি প্রথার সামনে দাঁড়াবে, যেটাকে আমরা প্রশ্ন করার সাহস পাইনি। সে প্রশ্ন করলে তাকে থামিয়ে দেওয়ার আগে ভাবা দরকার—আমরা কি চাই, আমাদের ভুলটুকুও সে উত্তরাধিকার হিসেবে গ্রহণ করুক?
একটি প্রথা কত পুরোনো, তা দিয়ে তার মর্যাদা নির্ধারিত হয় না। মানুষকে কতটা মর্যাদা দেয়, সেটাই বড় প্রশ্ন।
অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া এক প্রজন্মের দুর্বলতা হতে পারে। কিন্তু সেই অন্যায়কে প্রশ্নহীনভাবে পরের প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া—সেটাই তাকে পবিত্র প্রথার ছদ্মবেশ দেয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।