শিশুর কান্না আর রাষ্ট্রের নীরবতা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ২৩ মে, ২০২৬
আছিয়া, রামিসা, ইরা—এই নামগুলো এখন শুধু কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার নাম নয়। এগুলো আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, আইন ও বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একেকটি কঠিন প্রশ্ন। এমন প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর আমরা বারবার এড়িয়ে যেতে চেয়েছি। কিছুদিন উত্তেজনা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, মানুষ রাস্তায় নামে, বিচার দাবি করে। তারপর ধীরে ধীরে সব শান্ত হয়ে যায়। সংবাদপত্রের শিরোনাম বদলে যায়। নতুন কোনো ঘটনা পুরোনো ক্ষত ঢেকে দেয়। কিন্তু যাদের জীবন থেমে যায়, যাদের পরিবার প্রতিদিন ভাঙে, তাদের কাছে সময় কখনও এগোয় না।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, আমরা যেন এই চক্রের সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
কোনো শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে আমরা প্রথমে ক্ষুব্ধ হই। তারপর রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। কেউ আইন নিয়ে কথা বলে, কেউ বিচারবিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে, কেউ আবার সংবিধানের বিভিন্ন ধারা সামনে আনে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই দীর্ঘ তর্কের ভেতর শিশুটির জন্য ন্যায়বিচার কোথায়? আমরা কি সত্যিই এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে পেরেছি, যেখানে একজন শিশু নিরাপদ থাকবে? যেখানে অপরাধী প্রভাব, ক্ষমতা বা দীর্ঘসূত্রতার আড়ালে লুকাতে পারবে না?
বাস্তবতা হলো, পারিনি।
আমাদের দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি এত গভীরে ঢুকে গেছে যে মানুষ এখন আর দ্রুত বিচার আশা করে না। বরং তারা ধরে নেয়—কিছুদিন আলোচনার পর ঘটনাটি হারিয়ে যাবে। এই মানসিকতা শুধু রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নয়, এটি পুরো সমাজের ব্যর্থতা। কারণ একটি অপরাধ তখনই ভয়ংকর হয়ে ওঠে, যখন অপরাধী বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সে শেষ পর্যন্ত পার পেয়ে যাবে।
আর এখানেই সবচেয়ে বড় সংকট।
আমরা প্রায়ই বলি, শিশু জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু বাস্তবে শিশুদের নিরাপত্তাকে কখনও রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হয়নি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো—এসব নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু শিশু সুরক্ষা নিয়ে কার্যকর সামাজিক আন্দোলন খুব কম দেখা যায়। অথচ একটি সভ্য সমাজের প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত—সেখানে শিশুরা কতটা নিরাপদ।
একটি শিশু যখন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন শুধু একটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; পুরো সমাজের নৈতিক ভিত্তি কেঁপে ওঠে। কারণ শিশুরা নিজের নিরাপত্তা নিজেরা নিশ্চিত করতে পারে না। তারা রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজের ওপর নির্ভরশীল। সেই জায়গাতেই যদি তারা নিরাপত্তা না পায়, তাহলে আমাদের উন্নয়ন, অর্থনীতি কিংবা রাজনৈতিক অগ্রগতি—সবকিছুই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
আমরা অনেক সময় আইনকে শুধু কাগজের ভাষায় দেখি। কিন্তু আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো দুর্বলকে সুরক্ষা দেওয়া। যদি একজন শিশু বছরের পর বছর বিচার না পায়, যদি মামলার পর মামলা ঝুলে থাকে, যদি সাক্ষী ভয় পায়, যদি প্রভাবশালীরা চাপ সৃষ্টি করতে পারে—তাহলে সেই আইন সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাস হারায়। তখন মানুষ ক্ষুব্ধ হয়, হতাশ হয়, কখনও কখনও আইন নিজের হাতে তুলে নিতেও চায়। বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা ভেঙে পড়া কোনো রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক সংকেত।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি—শিশু নির্যাতন কেবল আইনি সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমস্যাও। পরিবারে সচেতনতার অভাব, সামাজিক নীরবতা, “মান-সম্মান” বাঁচানোর সংস্কৃতি, অপরাধীকে আড়াল করার প্রবণতা—এসব মিলেই অপরাধীদের সাহসী করে তোলে। অনেক পরিবার ভয়, লজ্জা বা সামাজিক চাপে অভিযোগই করতে চায় না। ফলে অপরাধীরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
শুধু কঠোর শাস্তি দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রয়োজন দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার, ভুক্তভোগীর মানসিক সহায়তা।
আর সবচেয়ে জরুরি—শিশুদের শেখাতে হবে কোন আচরণ অনিরাপদ, কীভাবে সাহায্য চাইতে হয়। একই সঙ্গে বড়দেরও শেখাতে হবে: নীরবতা কখনও নিরপেক্ষতা নয়; অনেক সময় নীরবতা অপরাধকে বাঁচিয়ে রাখে।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, আমরা প্রতিবাদ করি, কিন্তু ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারি না। যেন প্রতিটি ঘটনার প্রতি আমাদের ক্ষোভেরও একটি মেয়াদ আছে। কিছুদিন পর আমরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাই। অথচ অপরাধীরা এই ভুলে যাওয়ার সংস্কৃতিকেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে।
আজ প্রয়োজন কেবল আবেগ নয়, স্থায়ী সামাজিক চাপ।
ক্ষোভের মেয়াদ যেন ফেসবুক ট্রেন্ডের মতো না হয়।
এমন চাপ, যা বিচার প্রক্রিয়াকে থেমে যেতে দেবে না। এমন চাপ, যা রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দেবে—শিশু সুরক্ষা কোনো দয়া নয়, এটি মৌলিক দায়িত্ব।
আছিয়া, রামিসা, ইরারা শুধু কিছু নাম নয়। তারা আমাদের ব্যর্থতার আয়না। তাদের ভুলে যাওয়া মানে শুধু কয়েকটি ঘটনার স্মৃতি হারানো নয়; এর মানে হলো আমরা ধীরে ধীরে অন্যায়ের সাথে সহাবস্থান করতে শিখে ফেলছি।
এটাই সবচেয়ে বড় লজ্জা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।