ধর্ষণ: ক্ষমতার সংস্কৃতি, বিচারহীনতা এবং সমাজের নীরব সহিংসতা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
প্রবন্ধ | ৯ মার্চ ২০২৬
গ্রাম হোক বা শহর, বাসা হোক বা রাস্তা—বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্তে, প্রায় প্রতিদিনই একই শব্দটি আমাদের সামনে ফিরে আসে। ধর্ষণ।
পত্রিকার পাতায় ঝলসে ওঠে। টেলিভিশনের স্ক্রলিং টেক্সটে ভেসে বেড়ায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভের ঝড় ওঠে—কিছুক্ষণের জন্য।
তারপর? কয়েকদিন পরেই সেই ক্ষোভ ম্লান হয়ে যায়। সংবাদ বদলায়। অন্য কোনো ঘটনা সামনে চলে আসে। কিন্তু যে মানুষটির জীবন ভেঙে পড়েছিল, সে তো আর বদলায় না।
ধর্ষণ শুধু একটি অপরাধ নয়—বলা ভাল, এটি একজন মানুষের আত্মসম্মান, নিরাপত্তাবোধ এবং স্বাধীনতার ওপর চালানো নির্মম আক্রমণ। আরও উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো, এই অপরাধ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা বলে মনে হয় না; বরং এটি সম্ভবত একটি গভীর সামাজিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ।
ধর্ষণ কী বলতে গেলে
সহজ ভাষায়, ধর্ষণ মানে কারো সম্মতি ছাড়া তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম বা অন্য যেকোনো ধরনের যৌন অনুপ্রবেশ ঘটানো। এটি শারীরিক বলপ্রয়োগের মাধ্যমে হতে পারে, ভয় দেখিয়ে হতে পারে, সামাজিক চাপ সৃষ্টি করে—অথবা ক্ষমতার অপব্যবহার করে। এমনকি যে ব্যক্তি সম্মতি দেওয়ার মানসিক বা শারীরিক অবস্থায় নেই—মাতাল, মানসিকভাবে অসুস্থ, বা অপ্রাপ্তবয়স্ক—তার সঙ্গেও যৌন সম্পর্ক স্থাপন ধর্ষণের পর্যায়ে পড়ে।
তাই একে শুধু ফৌজদারি অপরাধ বললে হয়তো কম বলা হবে; এটি মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘনও বটে।
কেন বাড়ছে এই অপরাধ
ধর্ষণের বিস্তার কোনো একক কারণে ঘটে না। সমাজের নানা স্তরের দুর্বলতা একত্রিত হয়ে এই অপরাধকে বাড়িয়ে তোলে বলেই মনে হয়।
ক্ষমতার সংস্কৃতি
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটা বিষয় বারবার চোখে পড়ে—ক্ষমতার প্রভাব। অনেক ঘটনায় দেখা যায়, অপরাধীরা কোনো না কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী বলয়ের সঙ্গে যুক্ত। সেই পরিচয়কে তারা শাস্তি এড়ানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে তাদের মনে এক ধরনের বিপজ্জনক আত্মবিশ্বাস জন্মে: "আমার কিছু হবে না।" এই দায়মুক্তির বোধ সমাজে অপরাধের সাহস বাড়িয়ে দেয় বলেই মনে হয়।
বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের শাস্তি কঠোর—মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু আইন যতই কঠোর হোক না কেন, তার প্রয়োগ যদি দুর্বল হয়, তাহলে অপরাধীর কাছে সেই আইন তেমন ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় না। মামলার তদন্ত দীর্ঘায়িত হয়, সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট হয়ে যায়, বিচার বিলম্বিত হয়—ফলে ন্যায়বিচার অনেক সময় অধরাই থেকে যায়।
সামাজিক নীরবতা
ধর্ষণের ঘটনায় প্রায়ই দেখা যায়, ভুক্তভোগীর পরিবার সামাজিক লজ্জা, অপমান বা নিরাপত্তার ভয়ে অভিযোগ করতে চায় না। এই নীরবতা অপরাধীদের সবচেয়ে বড় শক্তি। অপরাধ প্রকাশ্যে আসে না, বিচারও হয় না।
বিকৃত সামাজিক মনস্তত্ত্ব
ধর্ষণ শুধু আইনের দুর্বলতা থেকে জন্মায় না। অনেক সময় এটি বিকৃত মানসিকতা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির ফসল। নারীকে সমান মানুষ নয়, ভোগ্যবস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতা; নারীর স্বাধীনতাকে সন্দেহের চোখে দেখা; অথবা ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার সংস্কৃতি—এসবই অপরাধের পেছনে ভূমিকা রাখে বলে মনে হয়।
ধর্ষকের পরিচয়
ধর্ষকের কোনো দল নেই, কোনো মত নেই, কোনো সামাজিক পরিচয় নেই। তার একটাই পরিচয়—সে একজন অপরাধী। দল বা মতাদর্শ যাই হোক না কেন, আইনের সামনে তার পরিচয় হওয়া উচিত কেবল একটি: অপরাধী।
প্রতিরোধের বাস্তব পথ
ধর্ষণ রোধ করতে শুধু আইন করলেই হবে না; দরকার কার্যকর ব্যবস্থা।
থানায় অভিযোগ গ্রহণ হতে হবে তাৎক্ষণিক। কোনো অজুহাতে অস্বীকার করা চলবে না। অনলাইনে নিরাপদ অভিযোগের সুযোগ থাকলে হয়তো অনেক ভুক্তভোগী সহজে সামনে আসতেন। প্রত্যেক থানায় নারী কর্মকর্তার মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা থাকলে নিরাপত্তাবোধ বাড়ত। অপরাধের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ডিএনএ পরীক্ষা ও নমুনা সংগ্রহ করলে বিচার প্রক্রিয়া শক্তিশালী হতো। আর ভুক্তভোগীদের জন্য চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও মানসিক পরামর্শের সমন্বিত কেন্দ্র থাকা জরুরি বলেই মনে হয়।
শেষ কথা
ধর্ষণ কোনো একদিনের সমস্যা নয়; এটি দীর্ঘদিনের সামাজিক সংকট। সমাধানও একদিনে সম্ভব নয়। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার—যখন অপরাধীরা বুঝবে যে ক্ষমতা নয়, আইনই শেষ কথা, তখনই পরিবর্তন শুরু হবে বলে আশা করা যায়।
একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত শক্তি নির্ধারিত হয়, সে সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল সদস্যদের কতটা নিরাপত্তা দিতে পারে তার মাধ্যমে। যদি একটি নারী, একটি শিশু, একটি মানুষ নিরাপদ না থাকে—তাহলে সেই সমাজের উন্নয়ন বা সভ্যতার দাবি কেবল কাগজের কথাই হয়ে থাকে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।