জয়গুন বেঁচে থাকার যুদ্ধের আরেক চরিত্র
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | মার্চ ২৫, ২০২৬
তওবা করেও হার মানেননি—আবু ইসহাকের জয়গুন শুধু বাঁচেননি, যুদ্ধ করেছেন!
প্রথম পড়েছিলাম কলেজে। সূর্য দীঘল বাড়ি, তৃতীয় খণ্ড। জয়গুনের প্রবেশ দৃশ্যেই থমকে গেছিলাম। ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটা এক নারী, যার শরীর ভাঙা, কিন্তু চোখে আগুন। আমি ভাবেছিলাম, এ তো কোনো নায়িকা নয়—এ তো আমার মা, আমার খালা, আমার প্রতিবেশী।
কিন্তু জয়গুন তাদের চেয়েও আলাদা। কেন? কারণ তিনি হার মানেননি।
১৯৫৫ সালের গ্রামবাংলা। নারীর জায়গা ছিল ঘরের কোণে, আঙিনায়, ধানকলের পাশে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিয়ম ছিল লোহার চেয়েও কঠিন। আর জয়গুন? তিনি তো শারীরিকভাবেই অক্ষম—ক্রাচ ছাড়া এক পা এগোতে পারতেন না।
কিন্তু আবু ইসহাক কী দেখিয়েছেন! জয়গুনের অক্ষমতা তার বাধা হয়নি, হয়েছে অস্ত্র। সমাজ তাকে "অবলা" ভেবেছিল, কিন্তু তিনি প্রমাণ করলেন—অবলা নন, অদম্য।
মনে আছে সেই দৃশ্য? ধানকলে কাজ, মেয়ের বিয়ের চিন্তা, ছেলের অসুখ—সবকিছু একসাথে। জয়গুন কাঁদেননি। কাঁদলে হয়তো স্বস্তি পেতেন, কিন্তু সময় নষ্ট। তিনি হিসাব করলেন, পরিকল্পনা করলেন, লড়াই করলেন। একা।
গদু প্রধান। নামটা শুনলেই শিউরে ওঠে। গ্রামের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ, যার কথা শুনতে হয়, যার বিরুদ্ধে যাওয়া সাহসের কাজ। জয়গুন গেলেন। না, ঘরে বসে কাঁদেননি, সরাসরি মুখোমুখি হলেন। সেই সংলাপ পড়ে আমি ভাবেছিলাম—এ কীভাবে সম্ভব? একজন "অবলা" নারী, একজন "শক্তিশালী" পুরুষের বিপক্ষে?
কিন্তু আবু ইসহাক দেখিয়েছেন, শক্তি শুধু শরীরে নয়। মনের জোর, চেতনার দৃঢ়তা—এও শক্তি। এবং কখনও কখনও, এটি বেশি কার্যকর।
আমি নিজে একবার দুর্বল অবস্থায় ছিলাম। অসুখে শয্যাশায়ী, কাজে ফিরতে পারছিলাম না। তখন জয়গুনের কথা মনে পড়েছিল। ভাবলাম, তিনি পারলেন, আমি কেন নয়? এটি নায়িকার গল্প নয়, এটি বেঁচে থাকার গল্প।
কুসংস্কার আর ধর্মীয় গোঁড়ামি—১৯৫৫ সালের গ্রামবাংলার বাতাসে এটি ছিল স্বাভাবিক। নারীকে "পাপী" ভাবা, "অপবিত্র" ভাবা—চলতি বিষয়। জয়গুন এসব উপেক্ষা করলেন। না, তিনি বিদ্রোহী ছিলেন না। তিনি বাস্তববাদী ছিলেন। জানতেন, খেতে না পেলে ধর্ম বাঁচে না, কুসংস্কার পেট ভরায় না। তাই তিনি জীবিকার সংগ্রামকে প্রাধান্য দিলেন। তওবা করলেন, কিন্তু হার মানলেন না।
এখানেই চরিত্রের গভীরতা। জয়গুন "নিখুঁত" নন। তিনি "বাস্তব"। তিনি সমাজের চাপে তওবা করেন, কিন্তু নিজের লক্ষ্য থেকে সরেন না। এটি কাপুরুষতা নয়, এটি কৌশল। এবং কৌশলও বীরত্বের অংশ।
কেন জয়গুন এ যুগের নারীদের জন্য "আত্মোন্নয়নের প্রতীক"?
আমি ভাবি, কারণ তিনি দেখিয়েছেন—পরিস্থিতি যাই হোক, নিজের অধিকার আদায় করা যায়। শরীর ভাঙা থাকলেও মন ভাঙা থাকতে হয় না। সমাজ যখন "অবলা" বলে, তখন "অদম্য" হয়ে ওঠা যায়। এটি সহজ নয়। কিন্তু সম্ভব।
আধুনিক নারীরা অনেক সুবিধা পেয়েছেন—শিক্ষা, চাকরি, স্বাধীনতা। কিন্তু মনের জোর? সেটি কি একই রকম? আমি দেখেছি, অনেক শিক্ষিত, স্বাধীন নারীও সমাজের চাপে নিঃশব্দে সরে যান। জয়গুন সরেননি। ক্রাচ নিয়েও দাঁড়িয়েছিলেন।
এটি শিক্ষা নয়, এটি চেতনা।
আবু ইসহাকের কলম যে কীভাবে এই চরিত্র তৈরি করল, তা এখনো বোধগম্য নয় আমার কাছে। হয়তো তিনি নিজেও দেখেছিলেন এমন নারী—১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের পর গ্রামবাংলার হাজারো জয়গুনকে, যারা শুধু বাঁচেননি, লড়াই করেছেন। কিন্তু তিনি তাদের গল্পে "অদম্য" যোগ করলেন। যা ছিল না, তা দেখালেন। যা সম্ভব, তা বিশ্বাস করালেন।
জয়গুন শুধু চরিত্র নন, সম্ভাবনা। প্রতিটি নারীর, প্রতিটি দুর্বলের, প্রতিটি হার মানা মানুষের—যে হার মানতে চায় না।
আপনি কি মনে করেন আজকের সমাজে জয়গুনের মতো চরিত্র টিকে থাকতে পারতো? হ্যাঁ না কমেন্টে জানান—আমি নিজেও নিশ্চিত নই। কারণ আজকের সমাজ ভিন্ন, কিন্তু চাপ একই। হয়তো বেশি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।