নিজেকে আবার গুছিয়ে নেওয়া যায়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ২৫ মে, ২০২৬
ভেঙে যাওয়ার পরও মানুষকে আবার গুছিয়ে নিতে দেখেছি। কোনো মন্ত্রে না, ছোট ছোট অভ্যাসে।
হতাশা থেকে বের হয়ে আসা মানে হঠাৎ করে সব ঠিক হয়ে যাওয়া না। বরং নিজের ভেতরের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় হওয়া। খুব ধীরে, খুব বাস্তবভাবে।
শুরুটা করতে হয় নিজেকে একটু সময় দিয়ে। সবকিছু থেকে একসাথে পালিয়ে না গিয়ে বরং নিজের ভেতরে কী ঘটছে সেটা বোঝার চেষ্টা করা দরকার। আমি ঠিক কী নিয়ে কষ্ট পাচ্ছি, কোথায় আটকে গেছি—এই প্রশ্নগুলোকে ভয় না পেয়ে দেখা।
ভয়কে এড়িয়ে গেলে সেটা আরও বড় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ধীরে ধীরে তাকে বুঝতে শিখলে সে নিজের জায়গা হারায়। অনেক সময় ভয় আসলে বাস্তবের চেয়ে বড় কিছু না—শুধু অজানা ভবিষ্যতের ছায়া।
নিজেকে একা করে না ফেলে ছোট ছোট অভ্যাসে ফিরে যাওয়া জরুরি। পুরোনো পছন্দের কিছু কাজ, গান শোনা, লেখা, ছবি আঁকা—যেগুলো একসময় ভালো লাগত, সেগুলো আবার চেষ্টা করা যায়। সবকিছু নিখুঁত হতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই।
মনকে সারাক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করতে যাওয়ার চেয়ে কাজের দিকে ফিরে যাওয়া অনেক বেশি কার্যকর। ছোট কাজ, ছোট দায়িত্ব, ছোট লক্ষ্য—এগুলো ধীরে ধীরে ভেতরের ভার কমায়। মানুষ আসলে কাজের মধ্যেই আবার নিজেকে খুঁজে পায়।
যে বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে, সেগুলো নিয়ে অযথা লড়াই না করে যে জিনিসগুলো নিজের হাতে আছে সেগুলোর দিকে মন দেওয়া দরকার। নিজের সময়, নিজের রুটিন, নিজের চেষ্টা—এই জায়গাগুলোই ধীরে ধীরে বদল আনে।
একা থাকাটা সবসময় খারাপ না, কিন্তু একা হয়ে যাওয়াটা খারাপ। তাই মাঝে মাঝে কাছের মানুষের কাছে ফিরে যাওয়া—একটা নীরব শক্তি দেয়। কারও সাথে এক কাপ চা, একটা সাধারণ কথা—এগুলোও অনেক সময় ভেতরের চাপ কমিয়ে দেয়।
নিজের শরীরের দিকেও ফিরে তাকানো দরকার। সকালবেলা একটু হাঁটা, আলো দেখা, শ্বাস নেওয়া—এই ছোট জিনিসগুলো মনে করিয়ে দেয়, জীবন থেমে যায়নি।
শিল্পের সাথে যুক্ত মানুষ হলে সেই জায়গায় ফিরে যাওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। গান, লেখা, আঁকা—এসব শুধু শখ না, অনেক সময় এগুলোই ভেতরের ভাষা। যেটা বলা যায় না, সেটা সৃষ্টিতে বের হয়ে আসে।
ভয়কে পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব না। কিন্তু তার সাথে থাকা শেখা যায়। কষ্ট এলে কাঁদা যায়, চুপ থাকা যায়, আবার ধীরে ধীরে ফিরে দাঁড়ানোও যায়। আবেগকে লুকানো দরকার নেই, কারণ চাপা দিলে সেটা ভেতরে ভারী হয়ে থাকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিজেকে গুরুত্ব দেওয়া শেখা। পরিবারকে ভালোবাসা, কাছের মানুষদের জানানো, ছোট ছোট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ—এসব মানুষকে ভেতর থেকে আবার জীবনের সাথে যুক্ত করে।
কেউ পরিবর্তন শুরু করলে চারপাশ থেকে কথা আসবেই। সব কথা শোনার দরকার নেই। কারণ সবাই আপনার যুদ্ধটা বোঝে না। আপনি কীভাবে ভেঙেছিলেন, সেটা অনেকেই দেখেনি—তাই আপনার দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াটাও সবাই বুঝবে না।
সবশেষে একটা সত্য খুব সহজ—মানুষ থেমে যায় না, শুধু কখনো কখনো ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আর ক্লান্ত মানুষকেই আবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াতে হয়।
এক জীবনে বারবার নিজেকে নতুন করে শুরু করা যায়। প্রতিদিনই একটা নতুন সুযোগ। খুব বড় কিছু করার দরকার নেই—শুধু আজকের দিনটা আগের চেয়ে একটু ভালোভাবে বাঁচা।
কারণ শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকা মানে শুধু টিকে থাকা না—আবার ফিরে আসাও।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।