দারিদ্র্যের আগামীকাল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ২২ আগস্ট ২০২৬
“যার আগামীকাল কীভাবে চলবে জানা নেই, তাকে পাঁচ বছর পরের স্বপ্ন দেখতে বলা নিষ্ঠুরতা।”
আমরা দরিদ্র মানুষকে খুব সহজে কিছু পরামর্শ দিই, সঞ্চয় করুন, ভবিষ্যতের কথা ভাবুন, সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়ান, নতুন দক্ষতা শিখুন, ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগ করুন।
পরামর্শগুলো ভুল নয়।
কিন্তু আমরা প্রায়ই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে যাই, ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করারও একটা ভিত্তি লাগে।
যে মানুষটি আজ রাতে পরিবারের জন্য খাবার জোগাড় করতে পারবে কি না, সেটা নিয়ে চিন্তায় আছে, তাকে পাঁচ বছর পরের জন্য টাকা জমাতে বলা সহজ। কিন্তু তার কাছে আজকের পাঁচশ টাকা আর পাঁচ বছর পরের পাঁচ হাজার টাকা এক জিনিস নয়।
আজকের পাঁচশ টাকা হয়তো চাল কিনবে, সন্তানের ওষুধ কিনবে, বাড়িভাড়া মেটাবে কিংবা পরদিন কাজে যাওয়ার ভাড়াটা জোগাড় করবে।
তাই দরিদ্র মানুষের জীবন অনেক সময় “আগামীকাল” দিয়ে নয়, “আজ” দিয়ে শুরু এবং শেষ হয়।
আজটাই যখন সব
আমরা অনেক সময় বলি,
“ওরা ভবিষ্যতের কথা ভাবে না।”
কথাটা পুরোপুরি সত্যি নয়।
অনেক দরিদ্র মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়েই সবচেয়ে বেশি চিন্তা করেন। কিন্তু সেই ভবিষ্যতের জন্য বর্তমানকে ছাড়ার সামর্থ্য তাঁদের থাকে না।
একজন দিনমজুর আজ কাজ না পেলে আজকের বাজার হবে না।
একজন রিকশাচালক অসুস্থ হলে শুধু চিকিৎসার খরচ নয়, সেদিনের আয়টাও হারান।
একজন গৃহকর্মী কয়েক দিন কাজে যেতে না পারলে সংসারের হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়।
ছোট দোকানদার অসুস্থ হলে দোকান বন্ধ, আয় বন্ধ।
এমন জীবনে “কিছু টাকা রেখে দাও”—এই পরামর্শটা যত সহজ শোনায়, বাস্তবটা তত সহজ নয়।
কারণ অনেক সময় সঞ্চয়ের অভ্যাসের অভাব নয়, সঞ্চয় করার মতো উদ্বৃত্তই থাকে না।
ছোট বিপদ, বড় পতন
মধ্যবিত্ত পরিবারের মোবাইল নষ্ট হলে সেটা বিরক্তিকর।
দরিদ্র মানুষের কাজের ফোনটি নষ্ট হলে সেটাই হয়তো আয় বন্ধ হওয়ার কারণ।
একজন মধ্যবিত্ত মানুষ তিন দিন অসুস্থ হলে সঞ্চয় থেকে খরচ চালাতে পারেন।
একজন দিনমজুর তিন দিন কাজে যেতে না পারলে চিকিৎসার পাশাপাশি তিন দিনের আয়ও হারান।
এটাই দারিদ্র্যের বড় বাস্তবতা।
দারিদ্র্য শুধু কম আয় নয়। দারিদ্র্য হলো বিপদ সামলানোর ক্ষমতার অভাব।
একটা ছোট ধাক্কা একজনকে কয়েক দিন পিছিয়ে দেয়, আরেকজনকে কয়েক মাস বা কয়েক বছর পিছিয়ে দিতে পারে।
তখন ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করার বদলে মানুষ বারবার বর্তমানের গর্তটাই ভরাট করে।
ঋণ নেয়।
ঋণ শোধ করে।
আবার বিপদ আসে।
আবার ঋণ নেয়।
এই চক্রের মধ্যে ভবিষ্যৎ কোথায় জায়গা পাবে?
যখন ভবিষ্যৎ কিনতে বর্তমান বিক্রি করতে হয়
আমরা বলি, “সন্তানকে ভালোভাবে পড়ান।”
কথাটা অবশ্যই ঠিক।
কিন্তু দরিদ্র পরিবারের কাছে পড়াশোনার খরচ শুধু স্কুলের ফি নয়। বই, খাতা, পোশাক, যাতায়াত, পরীক্ষা,সবকিছু মিলিয়ে একটা চাপ তৈরি হয়।
তার ওপর সন্তানটি যদি কাজ করতে পারে, তাহলে তার সামান্য আয়ও পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তখন একজন বাবা-মাকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যেটা বাইরে থেকে দেখে বিচার করা খুব সহজ।
“ছেলেটাকে পড়ানো উচিত ছিল।”
হ্যাঁ, উচিত ছিল।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—পড়ানোর মতো নিরাপত্তা কি পরিবারটির ছিল?
একই কথা দক্ষতা শেখার ক্ষেত্রেও।
একজন মানুষ জানেন, বর্তমান কাজ দিয়ে তাঁর জীবন বদলাবে না। তিনি নতুন কিছু শিখতে চান। কিন্তু প্রশিক্ষণে যেতে হলে কয়েক মাস কাজ কমাতে হবে। কাজ কমলে আয় কমবে। আয় কমলে সংসারে খাবারের সংকট হবে।
তাহলে তিনি কী করবেন?
অনেক সময় এমন একটি কাজেই থেকে যেতে হয়, যেটা ভবিষ্যৎ বদলাবে না, কিন্তু আজকের দিনটা চালিয়ে দেবে।
এখানে মানুষটি অলস নয়।
সে ভবিষ্যৎ বোঝে না—এটাও সত্যি নয়।
তার সামনে নিরাপদ বিকল্প নেই।
শুধু পরিশ্রম কি যথেষ্ট?
“পরিশ্রম করলে মানুষ সফল হবেই”—কথাটা শুনতে সুন্দর। কিন্তু বাস্তবতা একটু বেশি কঠিন।
দুজন মানুষ একই পরিমাণ পরিশ্রম করলেন। একজনের পরিবার তাকে পড়াশোনা শেষ করার সময় দিল। অন্যজনকে অল্প বয়সেই কাজে নামতে হলো।
একজন অসুস্থ হলে পরিবার চিকিৎসা করাল। অন্যজন অসুস্থ হয়েও কাজে গেলেন, কারণ একদিনের আয় বন্ধ মানেই সংসারে খাবারের সংকট।
একজন ব্যর্থ হলে আবার চেষ্টা করার সুযোগ পেলেন। অন্যজন একবার ব্যর্থ হয়েই ঋণের মধ্যে পড়ে গেলেন।
তাহলে সাফল্যের গল্পে শুধু পরিশ্রমের হিসাব রাখলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
পরিশ্রম মানুষকে এগিয়ে নেয়। কিন্তু সুযোগ ঠিক করে দেয়—সে কতদূর পর্যন্ত এগোতে পারবে।
এই কারণেই দারিদ্র্য এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে চলে যায়।
বাবার আয় কম।
তাই সন্তানের শিক্ষা সীমিত।
শিক্ষা সীমিত হওয়ায় ভালো কাজের সুযোগ কম
আয় আবার কম থাকে।
পরের প্রজন্মও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়।
তারপর আমরা বলি, “আরও একটু পরিশ্রম করলে পারত।”
কিন্তু প্রশ্নটা হওয়া উচিত,
“তার সামনে দরজা কয়টা খোলা ছিল?”
দারিদ্র্য থেকে বের হতে পরিশ্রম অবশ্যই দরকার। কিন্তু শুধু পরিশ্রম যথেষ্ট নয়।
দরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা শেখার সুযোগ, নিরাপদ কাজ, সঞ্চয়ের সামান্য অবকাশ এবং একবার পড়ে গেলে আবার দাঁড়ানোর সুযোগ।
কারণ ক্ষুধার্ত মানুষকে স্বপ্ন দেখতে বলা যায়।
কিন্তু স্বপ্নটা বাঁচিয়ে রাখার মতো নিরাপত্তাও তাকে দিতে হয়।
যার আগামীকাল অনিশ্চিত, তাকে পাঁচ বছর পরের কথা ভাবতে বলার আগে আমাদের নিজেদের কাছেই একটা প্রশ্ন করা দরকার।
আমরা কি তার আগামীকালটাকে একটু নিরাপদ করেছি?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।