পার্বতীর প্রত্যাখ্যানের শক্তি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | মার্চ ২৪, ২০২৬
দেবদাস শুধু মদ খেয়ে মরেছে, কিন্তু পারু বেঁচে গেছে—এটাই আসল কথা!
প্রথম দেবদাস পড়েছিলাম সতেরো বছর বয়সে। তখন কেঁদেছিলাম—দেবদাসের জন্য। মনে হয়েছিল, এ কী ভাগ্য, এ কী ভালোবাসা! কিন্তু দশ বছর পর আবার পড়লাম। এবার চোখ খুলে গেল। দেবদাস নয়, পার্বতী। তিনিই আসল নায়িকা। কেন? কারণ তিনি বেঁচেছিলেন। আসলে বেঁচেছিলেন।
রাতের অন্ধকারে একা দেবদাসের ঘরে ঢোকা—এটি সমকালীন সমাজে অকল্পনীয় সাহস। ভাবুন তো। একজন বিবাহিতা নারী, শাশুড়ির বাড়ি থেকে বেরিয়ে, রাতে, একা, পুরুষের ঘরে। শরৎচন্দ্র কী দেখিয়েছেন? পার্বতী শুধু ভালোবাসেন না, তিনি সিদ্ধান্ত নেন। কাজ করেন। ঝুঁকি নেন।
আমি নিজে একবার রাতে একা বেরিয়েছিলাম—জরুরি কাজে। মায়ের চোখে ভয় দেখেছিলাম। পার্বতীর চোখে সেই ভয় ছিল না। ছিল দৃঢ়তা। এটি ভালোবাসা নয়, এটি চেতনা।
"আমিই কি মুখ দেখাতে পারব?"—দেবদাসের এই কথা পড়ে আমি থমকে যাই। ভয়। পুরুষের ভয়। সমাজের চাপে, পারিবারিক মর্যাদায়, নিজের দুর্বলতায়—দেবদাস ভয় পেয়েছিলেন। আর পার্বতী? তিনি বলেছিলেন, "আমি আসব।" কোনো শর্ত নয়, কোনো দ্বিধা নয়।
এখানেই পার্থক্য। দেবদাস ভালোবাসেন, কিন্তু ভয় পান। পার্বতী ভালোবাসেন, কিন্তু ভয় পান না। কে বেশি শক্তিশালী?
আমার এক বন্ধু একবার বলেছিল, "পার্বতী অস্বাভাবিক। নারীরা এমন হয় না।" আমি বলেছিলাম, "হয়। কিন্তু সমাজ তাদের চাপ দেয়—'স্বাভাবিক' হতে। পার্বতী সেই চাপ উপেক্ষা করেছিলেন।"
বিয়ের পর দেবদাসকে ভোলা নয়—এটি গুরুত্বপূর্ণ। পার্বতী নতুন জীবনে এগিয়ে গেছেন। স্বামী, সংসার, দায়িত্ব—তিনি নিয়েছিলেন। কিন্তু ভেতরে? ভেতরে কী ছিল?
শরৎচন্দ্র স্পষ্ট করেননি। এটি তার কৌশল। পার্বতী "নিখুঁত" নন। তিনি "বাস্তব"। তিনি দেবদাসকে ভোলেননি, জীবন বেছে নিয়েছিলেন। এটি বিশ্বাসঘাতকতা নয়, এটি জীবন বেছে নেওয়া।
আমি ভাবি, কত নারী এমনই করেন। ভেতরে একজন, বাইরে আরেকজন। পার্বতী তাদের প্রতীক। কিন্তু তিনি শুধু প্রতীক নন, তিনি উদাহরণ—যে জীবন বেছে নেওয়া সম্ভব, ভালোবাসা সত্ত্বেও।
কেন পার্বতীর চরিত্র এত বেশি আলোচিত? ১৯টা সিনেমা। বিভিন্ন যুগ, বিভিন্ন ভাষা, বিভিন্ন অভিনেত্রী—কিন্তু পার্বতী থাকেন। কেন?
আমি মনে করি, কারণ পার্বতী "নিরাপদ" নন। তিনি "বিতর্কিত"। দর্শক তাকে বিচার করেন—"ভালো" না "মন্দ", "বিশ্বস্ত" না "প্রতারক"। এই বিচারই তাকে জীবন্ত রাখে। দেবদাস? তিনি "শহীদ"। শহীদরা বিচারের বাইরে। কিন্তু পার্বতী? তিনি বিচারের ভেতরে। আর বিচারের ভেতরেই জীবন।
দেবদাসের "ভালোবাসা", বনাম পার্বতীর "বাস্তবতা"—কে জিতল আসলে?
আমি ভাবি, প্রশ্নটাই ভুল। জয়-পরাজয় নয়, এটি দুই ধরনের জীবন। দেবদাস বেছে নিয়েছিলেন মৃত্যু। পার্বতী বেছে নিয়েছিলেন জীবন। কোনটি "উচ্চতর"? সাহিত্যিকরা বলবেন, দেবদাস। কিন্তু আমি? আমি বলব, পার্বতী। কারণ জীবনই শেষ কথা। মৃত্যু নয়।
শরৎচন্দ্র নিজেও কি এমন ভেবেছিলেন? জানি না। কিন্তু তিনি পার্বতীকে শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। দেবদাসকে মারেননি, তিনি নিজেই মরেছিলেন। পার্বতীকে মারেননি, তিনি বেঁচেছিলেন। লেখকের এই নির্বাচন কি দৈব না ইচ্ছাকৃত?
আমি মনে করি, ইচ্ছাকৃত। শরৎচন্দ্র জানতেন—পার্বতীই আসল। দেবদাস শুধু ছায়া।
শেষ পর্যন্ত, পার্বতী আমাকে শেখান। প্রত্যাখ্যানের শক্তি। ভালোবাসা সত্ত্বেও নিজের জীবন বেছে নেওয়ার সাহস। সমাজের চাপে না ভাঙার দৃঢ়তা। এটি "নারীবাদ" নয়, এটি "মানুষ হওয়া"।
আমি এখনো কখনও কখনও দেবদাসের মতো ভাবি—"আমিই কি মুখ দেখাতে পারব?" কিন্তু তারপর পার্বতীর কথা মনে পড়ে। তিনি পেরেছিলেন। আমিও পারব। হয়তো।
পারু কি দেবদাসকে ভুলতে পেরেছিলো নাকি জীবন ভুলিয়ে রেখেছিলো? আপনার মতামত দিন—আমি নিজেও নিশ্চিত নই। একবার একজন পাঠক বলেছিলেন, "ভুলতে পারলে ভালোবাসা ছিল না।" আরেকজন বলেছিলেন, "না ভুললে বেঁচে থাকা যায় না।" কে ঠিক? জানি না। জানতে চাই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।