শিশুর হাসি থাকুক উপাসনালয়ে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ০১ অক্টোবর ২০২৬
একটা ছোট শিশু বাবার হাত ধরে মসজিদে ঢুকেছে। বাবা নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন। শিশুটি কখনো বাবার দিকে তাকাচ্ছে, কখনো আশপাশ দেখছে। একটু পর পাশের আরেকটি শিশুর সঙ্গে কথা বলল, অল্প একটু হাসল, তারপর অস্থির হয়ে নড়াচড়া শুরু করল।
হঠাৎ একজন মুরব্বির ধমক।
‘চুপ করো।’
শিশুটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। আবার নড়ল। এবার তাকে হাত ধরে মসজিদ থেকে বের করে দেওয়া হলো।
বড়দের কাছে ঘটনাটি হয়তো কয়েক মিনিটের। নামাজের পরিবেশ ঠিক রাখার জন্য শিশুটিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, বিষয়টি সেখানেই শেষ। কিন্তু শিশুটির কাছে বিষয়টি সেখানেই শেষ নাও হতে পারে।
সে সেদিন নামাজের গুরুত্ব বুঝল না। শুধু বুঝল, মসজিদে গেলে বকা খেতে হয়।
পরের দিন বাবা যখন বলবেন, ‘চলো, মসজিদে যাই’, সে আগের মতো উৎসাহ নিয়ে নাও যেতে পারে। কয়েকবার এমন হওয়ার পর একদিন হয়তো বলেই বসবে, ‘আমি যাব না।’
তখন আমরা বলব, ‘ছেলেটা ধর্মের দিকে আগ্রহী নয়।’
কিন্তু প্রশ্নটা কি একটু অন্যভাবে করা উচিত নয়?
একটি শিশু জন্মের পর থেকেই সবকিছু বুঝে ফেলে না। তাকে ধীরে ধীরে শেখাতে হয়। মসজিদে কীভাবে থাকতে হয়, নামাজের সময় কেন শান্ত থাকতে হয়, অন্যের প্রার্থনার সময় কেন তাকে বিরক্ত করা যাবে না, এসবও তার শেখার বিষয়।
অবশ্য উপাসনালয়ে শৃঙ্খলাও জরুরি। শিশুর দৌড়াদৌড়ি বা চিৎকারে অন্যের প্রার্থনায় ব্যাঘাত ঘটলে তাকে থামাতে হবে। কিন্তু শাসন আর অপমান এক বিষয় নয়। সে দৌড়ালে বলা যায়, ‘চলো, এখানে আস্তে হাঁটি।’ সে কথা বললে বলা যায়, ‘নামাজ শেষ হলে তোমার সঙ্গে কথা বলব।’
শিশুদের প্রতি এমন ধৈর্যের একটি দৃষ্টান্ত ইসলামী ঐতিহ্যেও পাওয়া যায়। সহিহ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজে থাকা অবস্থায় কোনো শিশুর কান্না শুনলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন, যাতে শিশুটির মায়ের কষ্ট না হয়। ইবাদতের মর্যাদা বজায় রেখেও শিশুর অবস্থার প্রতি বিবেচনা করা সম্ভব।
শুধু একটি ধর্মের শিক্ষাতেই নয়, অন্য ধর্মীয় গ্রন্থেও শিশুর প্রতি মমতার কথা আছে। গীতায় (১২/১৩) বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কোনো জীবের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে না এবং সবার প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ ও করুণাশীল, সেই গুণবান। বাইবেলে (মথি ১৯:১৪) যিশুর বক্তব্য, শিশুদের তাঁর কাছে আসতে দিতে এবং তাদের বাধা না দিতে।
আমরা উপাসনালয় তৈরি করি, সংস্কার করি, সুন্দর করি। মসজিদের উন্নয়নে অনুদান দিই। মন্দির ও গির্জার জন্যও মানুষ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করে। কিন্তু শিশুদের জন্য আমরা কী করছি?
একটি মসজিদের ছোট্ট কোণে কয়েকটি চকলেট বা ক্যান্ডি রাখা যেতে পারে। খুব বড় খরচ নয়। প্রথম দিন শিশুটি হয়তো চকলেটের জন্য আসবে। কয়েকদিন পর চকলেটের চেয়ে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়াটাই তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে।
প্রতি জুমার নামাজের পর সামান্য তবারকের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। একটি খেজুর, একটি মিষ্টি বা সামান্য কোনো খাবারই যথেষ্ট। উদ্দেশ্য শুধু শিশুকে খাওয়ানো নয়, উপাসনালয়ের সঙ্গে তার মনে একটি আনন্দের স্মৃতি তৈরি করা।
একইভাবে মন্দিরে শিশুদের জন্য প্রসাদ বিতরণ, ধর্মীয় গল্প শোনানো বা বয়স অনুযায়ী ছোট আয়োজন করা যেতে পারে। গির্জাতেও শিশুদের জন্য গল্প, গান, অংশগ্রহণমূলক আয়োজন বা সামান্য খাবারের ব্যবস্থা করা সম্ভব। ধর্মীয় বিধান আলাদা হলেও শিশুদের সুন্দরভাবে ধর্মীয় পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত করে তোলার প্রয়োজনটি সবার ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।
এখানে বাবা-মায়ের ভূমিকাও কম নয়। শিশুকে শুধু উপাসনালয়ে নিয়ে গেলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাকে বুঝিয়ে বলতে হয়, এখানে কেন আসা হয়, কীভাবে আচরণ করতে হয় এবং অন্যের প্রার্থনার সময় কেন শান্ত থাকতে হয়।
একজন মুরব্বি যদি রাগ না করে শিশুটিকে পাশে বসান, সেটিও একটি শিক্ষা। একজন বাবা যদি নামাজ শেষে ছেলের মাথায় হাত রেখে বলেন, ‘আজ তুমি খুব ভালো ছিলে’, সেটিও একটি শিক্ষা। একজন মা যদি মেয়েকে মন্দিরে নিয়ে গিয়ে ধৈর্য ধরে নিয়ম বোঝান, সেটিও একটি শিক্ষা। একজন অভিভাবক যদি সন্তানকে গির্জায় নিয়ে গিয়ে সেখানকার নিয়ম ও পরিবেশের প্রতি সম্মান দেখাতে শেখান, সেটিও তার বেড়ে ওঠার অংশ।
শিশুর মনে ধর্মের প্রথম ছবি অনেক সময় বই থেকে আসে না। আসে বড়দের আচরণ দেখে।
তাই শাসন থাকবে, কিন্তু অপমান নয়। নিয়ম থাকবে, কিন্তু অকারণ ভয় নয়।
উপাসনালয়ে শুধু প্রার্থনার শব্দ নয়, শিশুর হাসিও থাকুক।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।