না বলার অপরাধ
(নারী, পরিবার ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
২২ অক্টোবর ২০২৬
ছোটবেলা থেকে মেয়েটিকে শেখানো হয়েছিল, বড়দের কথা শুনতে হয়, পরিবারের সম্মান রাখতে হয়, সবাইকে খুশি করতে হয়। শুধু কেউ তাকে শেখায়নি, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু ঘটলে কীভাবে বলতে হয়, ‘আমি রাজি নই।’
একদিন তার বিয়ের কথা উঠল। পাত্রের পরিবার ভালো, ছেলের চাকরি আছে, আত্মীয়স্বজনেরও পছন্দ। সবাই মেয়েটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করল। কীভাবে বিয়ে হবে, কোথায় থাকবে, কখন অনুষ্ঠান হবে—সব ঠিক হয়ে গেল। শুধু যে মেয়েটির বিয়ে, তার মতামতটাই কেউ ঠিকমতো জানতে চাইল না।
রাতে মা ঘরে এসে বললেন, “আমরা কি তোর খারাপ চাই? সবাই যখন ভালো বলছে, তখন তোর আপত্তি কোথায়?”
মেয়েটি বলতে চেয়েছিল, ছেলেটিকে তার পছন্দ হয়নি। কিন্তু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো আর বলা হলো না। সে জানত, নিজের অসম্মতির কথা জানালে পরদিন থেকেই তাকে বোঝানো শুরু হবে—কত কষ্ট করে বাবা-মা তাকে বড় করেছেন, এখন সে না বললে আত্মীয়দের কাছে তাঁদের মুখ থাকবে না।
শেষ পর্যন্ত মেয়েটি চুপ করে রইল। পরিবারের সবাই স্বস্তি পেল। শুধু মেয়েটি জানল, তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার নিজের কথাটাই সবচেয়ে কম গুরুত্ব পেয়েছে।
আপত্তি করলেই বেয়াদব
একটি মেয়ে ছোটবেলায় নিজের পছন্দের পোশাক পরতে চাইলে তাকে বলা হয়, মানুষ কী বলবে। বড় হয়ে নিজের পছন্দের পেশা বেছে নিতে চাইলে পরিবারের সিদ্ধান্ত সামনে আসে। বিয়ের সময় তার সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা, অথচ অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সম্মতিকেই তার সম্মতি বলে ধরে নেওয়া হয়।
তাদের শেখানো হয়, মানিয়ে নিতে পারা ভালো মেয়ের গুণ। প্রতিবাদ না করা ভদ্রতার লক্ষণ।
সমস্যা হলো, মানিয়ে নেওয়া আর নিজের অস্তিত্ব অস্বীকার করা এক বিষয় নয়।
পরামর্শের জায়গায় যখন নির্দেশ আসে, আর অসম্মতির জবাবে অপমান করা হয়, তখন সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসার পাশাপাশি ভয়েরও জন্ম হয়। মেয়েটি তখন আর ভাবে না, সিদ্ধান্তটি তার জন্য ভালো কি না। সে ভাবে, নিজের কথা বললে কে কষ্ট পাবেন।
ভালোবাসা, নাকি বাধ্যতা?
একটি মেয়ে বাবা-মাকে ভালোবাসে বলেই তাঁদের সব কথা মেনে চলবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও নিজের মত প্রকাশ করা যায়।
কিন্তু অনেক পরিবারে মেয়ের আনুগত্যকে ভালোবাসার প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়। সে যত বেশি নিজের ইচ্ছা বিসর্জন দেয়, তত বেশি প্রশংসা পায়।
এখানেই ভালোবাসা আর বাধ্যতা গুলিয়ে যায়।
যে মেয়ে পরিবারের মন রাখার জন্য নিজের পছন্দের বিয়েতে রাজি হয়, তার নীরবতাকে সব সময় সম্মতি ভাবা ভুল। কেউ চুপ করে আছেন মানেই তিনি রাজি, এমন নয়। কখনো তিনি ভয় পাচ্ছেন, আবার কখনো এতবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন যে নিজের কথা বলার আগ্রহটাই হারিয়ে ফেলেছেন।
‘না’ বলার অধিকার
একটি মেয়ের ‘না’ বলার অধিকার থাকা মানে এই নয় যে সে পরিবারের কাউকে গুরুত্ব দেবে না। এর অর্থ, তার নিজের শরীর, জীবন, পেশা, বিয়ে ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তার মতামতও গুরুত্ব পাবে।
পরিবারের দায়িত্ব শুধু মেয়েকে ভালোভাবে বড় করা নয়; তাকে এমন পরিবেশ দেওয়াও জরুরি, যেখানে সে ভয় ছাড়া নিজের কথা বলতে পারে।
সব ‘না’ রাগ করে বলতে হয় না। কখনো শান্তভাবে বলা একটি বাক্যও যথেষ্ট—“আমি তোমাদের কথা বুঝতে পারছি, কিন্তু এই সিদ্ধান্তে আমি রাজি নই।”
মেয়েটি পরিবারের সদস্য, পরিবারের সম্মান রক্ষার কোনো যন্ত্র নয়।
একটি পরিবার তখনই সত্যিকার অর্থে আপন হয়ে ওঠে, যখন সেখানে অসম্মতি জানালেও সম্পর্ক হারানোর ভয় পেতে হয় না।
যে মেয়েটি এত দিন সবাইকে খুশি রাখতে গিয়ে নিজের কথাই বলতে পারেনি, একদিন সে হয়তো প্রথমবারের মতো নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকবে। সেদিন কেউ তাকে জেদি বলবে, কেউ বলবে বদলে গেছে।
কিন্তু হয়তো সেদিনই সে প্রথমবার বুঝবে, নিজের কথা বলার জন্য কারও অনুমতি লাগে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।