কর্মক্ষেত্রের নীরব শোষণ
(‘অতিরিক্ত কাজ’ নয়, ‘অতিরিক্ত প্রত্যাশা’ই আসল সমস্যা)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী ⋄ ১৮ নভেম্বর ২০২৫
শহরের অফিস, কলকারখানা আর খোলামেলা কফিশপ—সব মিলিয়ে মনে হয় কর্মজীবীরা ঠিকঠাক কাজ করছে।
বাইরে হাসি, মিটিং, প্রেজেন্টেশন—সব কিছু সুষ্ঠু।
কিন্তু ভেতরে? প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে চাপ, প্রতিটি কাজের সঙ্গে মানসিক ধস।
এই দ্বৈত জীবনকে আমরা আজ বলি—কর্মক্ষেত্রের নীরব শোষণ।
বাংলাদেশি কর্মসংস্কৃতিতে এখন বার্নআউটকে “সম্মানের ব্যাজ” বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
যারা দীর্ঘ সময় কাজ চালায়, তারা মনে করে—“আমি দায়িত্বশীল, আমি উঁচু মর্যাদার যোগ্য।”
কিন্তু সেই মর্যাদার আড়ালে লুকানো আছে—নিরব চাপ, অতিরিক্ত প্রত্যাশা, মানসিক ক্লান্তি।
এই চাপকে কেউ সরাসরি বোঝে না, কেউ প্রকাশ করতে শেখায় না।
অফিসের ভেতরে যেমন কেউ চুপচাপ কাজ চালায়, তেমনি মনের ভেতরও চাপ বৃদ্ধি পায়।
অতিরিক্ত কাজ নয়, অতিরিক্ত প্রত্যাশাঃ
প্রায়শই আমরা ভাবি—কাজ বেশি করলে মানুষ ক্লান্ত হয়। কিন্তু মূল সমস্যা হল প্রত্যাশা।
যতক্ষণ পর্যন্ত একজন কর্মী বোঝে না—“আমার কাজ কখনও যথেষ্ট নয়”, ততক্ষণ সে কাজ করতে করতে নিজেকে ধ্বংস করে।
প্রতিটি সেলফ ইভ্যালুয়েশন, প্রতিটি ম্যানেজারের মন্তব্য, প্রতিটি প্রজেক্টের ডেডলাইন—
সবই একটি বারবার মনে করিয়ে দেয়, আপনি কখনও সম্পূর্ণ নন।
মানসিক চাপের এই ক্রমবর্ধমান সঞ্চয় একসময় শারীরিক ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ এবং বিষণ্ণতায় রূপ নেয়। যা আমরা স্বাভাবিক জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নিই, তা আসলে নীরব শোষণ।
প্রদর্শনী কর্মী ও চাপের দেয়ালঃ
দৈনন্দিন জীবনে আমরা সবাই দেখাই—
“সব ঠিক আছে, কাজ চলছে।”
কিন্তু ভেতরে—দুপুরে কফি ব্রেকেও চাপ বেড়ে যায়, রাতের সময় ইমেল চেক করাই মানসিক বোঝা বাড়িয়ে দেয়।
আমরা শুধু টিকে থাকি, কার্যকারিতা দেখাই,
কিন্তু মানসিক অবসাদ ভেতরে ক্রমবর্ধমান।
একজন জুনিয়র মনে করে—“আমার পরিশ্রমই আমাকে ভালো কর্মী বানায়।”
সিনিয়র কর্মকর্তা মনে করে—“তার কাজের ফলাফল যথেষ্ট নয়।”
সবাই প্রত্যাশার বোঝা বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু কেউ সত্যিই সাহায্য করে না।
মানুষ একাকী হয়ে যায়—কাজের চাপের সঙ্গে মানসিক চাপও বাড়ে।
স্মার্টফোন ও ডিজিটাল চাপের যোগফলঃ
কর্মজীবীরা দিনের অনেক সময় স্ক্রিনের সামনে কাটায়—ইমেল, মেসেজ, প্রজেক্ট আপডেট।
এখানেও এক ধরনের নীরব চাপ আছে।
স্মার্টফোনে সবকিছু পৌঁছানো সহজ, কিন্তু মানসিক বিরাম নেই।
প্রতিটি নোটিফিকেশন মনে করিয়ে দেয়—“কাজ শেষ হয়নি, আপনি যথেষ্ট দায়িত্বশীল নন।”
ডিজিটাল যুগের সুবিধা—শুধু সুবিধা নয়, এটি আরও এক স্তরের মানসিক দমন তৈরি করে।
বাইরের স্বীকৃতি, ভেতরের ধসঃ
অফিসে প্রশংসা, মাসিক বোনাস, নতুন দায়িত্ব—
সবই দেখায় যে আমরা সাফল্য অর্জন করছি।
কিন্তু রাতের অন্ধকারে, একা ঘরে বসে আমরা বুঝি—সফলতা দেখানো মাত্র আমাদের মনকে পূর্ণ করে না।
অতিরিক্ত প্রত্যাশা এবং মানসিক চাপের সঞ্চয় নীরব ধ্বংস ঘটায়।
একজন ম্যানেজার মনে রাখতে চায়—“আমার টিম সব ঠিকভাবে করছে।”
কিন্তু সেই টিমের ভেতরে, একেকজন সদস্য নিজের ভাঙন লুকিয়ে রাখে।
যে ভাঙন বাইরে দেখা যায় না, তারই নাম নীরব শোষণ।
শ্রেষ্ঠত্বের মূল্যবোধ ও মানসিক অবসাদঃ
কর্মজীবী সমাজে বার্নআউটকে স্বীকৃতিস্বরূপ দেখানো হয়- যত বেশি ক্লান্ত, তত বেশি ‘দায়িত্বশীল’।
কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হল—মানসিক অবসাদ এক ধরনের চুপচাপ শোষণ।
স্বপ্ন, মান, মর্যাদা—সবই পরিমাপযোগ্য, কিন্তু মানবিক সীমারেখা অদৃশ্য। মানুষ নিজের সীমা ভাঙার চেষ্টা করে, কিন্তু প্রত্যাশার ভার তার শারীরিক ও মানসিক শক্তি চোষে নীরবভাবে।
বাংলাদেশি কর্মসংস্কৃতিতে বার্নআউটকে সম্মানের ব্যাজ বানানো হয়েছে। কিন্তু আসল ব্যাজ হলো—অতিরিক্ত প্রত্যাশার সঙ্গে নিজের মানসিক শান্তি হারানো।
যারা প্রতিদিন শুধু টিকে থাকার লড়াই করে,
তারা কখনো পুরো সিস্টেমের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না। এইই কর্মক্ষেত্রের নীরব শোষণের কঠিন বাস্তবতা।
#কর্মক্ষেত্রের_শোষণ #অতিরিক্ত_প্রত্যাশা
#বাংলাদেশি_চাকরিজীবী #মানসিক_চাপ
#বার্নআউট_সংকট #নীরব_অবসাদ
#WorkplaceBurnout #SilentExploitation
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।