যান্ত্রিক শহরে ঘুমন্ত মানবতা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী সামাজিক প্রবন্ধ
৮ জুলাই, ২০২৬
আমাদের ঢাকা শহর। ইট-কংক্রিটের জঙ্গলে বেড়ে ওঠা এক অস্থির, অশান্ত নগরী। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত যে শহরের ধমনী বেয়ে ছুটে চলে ঝকঝকে মেট্রোরেল, যে শহরের বাতাসে মিশে থাকে অজস্র মানুষের ঘাম, স্বপ্ন আর ক্লান্তির ঘ্রাণ। প্রথম দেখায় মনে হতেই পারে, এটি আর দশটা স্বাভাবিক দিনের চেনা ছবি। কামরার ভেতর উজ্জ্বল আলো, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হাওয়া, মানুষের মুখে স্মার্টফোনের নীলচে দ্যুতি। কেউ গভীর মনোযোগে স্ক্রল করে চলেছে, কেউ কানে হেডফোন গুঁজে হারিয়ে গেছে নিজের জগতে, কেউবা জানালার কাচে কপাল ঠেকিয়ে উদাস চোখে দেখছে ছুটে চলা শহরটাকে।
কিন্তু একটুখানি সময় নিয়ে, একটুখানি হৃদয় দিয়ে তাকালেই খসে পড়ে আমাদের তথাকথিত সভ্য সমাজের পরিপাটি, সুগন্ধি মাখা মুখোশটা। তখন চোখে পড়ে এমন এক দৃশ্য, যা আমাদের ভেতরের সমস্ত দম্ভকে গুঁড়িয়ে দেয়।
আমরা প্রায়ই দেখি, বাসে, ট্রেনে কিংবা মেট্রোরেলে একজন নারী, একজন বৃদ্ধ অথবা শিশু কোলে কোনো মা উঠে দাঁড়ালেই কোনো না কোনো সহৃদয় পুরুষ সসম্মানে নিজের আসন ছেড়ে দেন। তখন আমাদের বুক গর্বে ভরে ওঠে। মনে হয়, না, সব শেষ হয়ে যায়নি। মানবিকতা এখনো বেঁচে আছে এই শহরের অলিতে-গলিতে। আমরা সেই ছবি তুলি, ফেসবুকের দেয়ালে পোস্ট করে লিখি, “মানবতা এখনো মরে যায়নি”। বাহবা কুড়াই, শেয়ার করি। কিন্তু সেই সহানুভূতি, সেই মানবিকতা কি আসলেই নিঃশর্ত? নাকি তা শুধু বিশেষ কিছু মুখ, বিশেষ কিছু পরিচয় দেখে জেগে ওঠে?
আজকের এই ছবিটি যেন তীব্র এক চপেটাঘাত হয়ে আঘাত করল আমাদের সেই সুপ্ত, সুবিধাবাদী বিবেককে। মেট্রোরেলের ঠিক মাঝখানে, শত মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ। তার এক পা অকেজো, ব্যান্ডেজ করা। শরীরের সমস্ত ভার অন্য পায়ের উপর রেখে তিনি কাঁপছেন। চোখেমুখে অসহ্য যন্ত্রণার স্পষ্ট ছাপ। প্রতিটি ঝাঁকুনিতে তার মুখটা কুঁকড়ে যাচ্ছে ব্যথায়। তিনি অসুস্থ, ভীষণভাবে অসুস্থ। চলাফেরার শক্তিটুকুও তার নেই।
অথচ তার চারপাশে? সারি সারি আসনে বসে আছে শত শত সুস্থ-সবল, কর্মক্ষম মানুষ। তরুণ, যুবক, মধ্যবয়স্ক—সব ধরনের মানুষ। কারো চোখ আটকে আছে ফোনের স্ক্রিনে, যেখানে অনবরত চলছে রিলস আর শর্টস। কেউ কানে ইয়ারপড গুঁজে চোখ বন্ধ করে আছে, যেন এই পৃথিবীর কোনো কোলাহল তাকে স্পর্শ করে না। কেউবা পাশের জনের সাথে খোশগল্পে মত্ত। সবাই দেখছে, কিন্তু কেউ দেখছে না। সবার চোখের সামনে একজন মানুষ তিলে তিলে কষ্ট পাচ্ছে, অথচ সবার কাছে তিনি অদৃশ্য। যেন মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা রক্তমাংসের মানুষটি নয়, একটি অনাহূত শূন্যতা।
মেট্রোরেলের প্রতিটি বগিতে অসুস্থ, বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্বা নারী আর বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্য আলাদা আসন বরাদ্দ থাকে। দেয়ালে বড় বড় অক্ষরে, ছবি এঁকে বুঝিয়েও দেওয়া হয়। কিন্তু হায়, নিয়মের অক্ষরগুলো আজ বড় নিষ্প্রাণ, বড় বেশি আনুষ্ঠানিক। কারণ আমাদের ভেতরের মানুষটা যদি ঘুমিয়ে থাকে, যদি আমাদের চোখে সহমর্মিতার কাজল না থাকে, তবে হাজারটা নিয়ম, লক্ষটা সাইনবোর্ড দিয়েও কোনো লাভ নেই। আইন দিয়ে মানুষকে বসতে বাধা দেওয়া যায়, কিন্তু হৃদয় দিয়ে কাউকে উঠে দাঁড়াতে বাধ্য করা যায় না।
এই দৃশ্যের পেছনে লুকিয়ে আছে এক নির্মম, প্রায় পৈশাচিক মনস্তাত্ত্বিক সত্য। একবার ভেবে দেখুন তো, আজ যদি এই মানুষটির জায়গায় কোনো তরুণী দাঁড়িয়ে থাকতেন? কোনো মা তার কোলের শিশুটিকে নিয়ে উঠতেন? অথবা কোনো অশীতিপর বৃদ্ধ? মুহূর্তেই বদলে যেত কামরার চিত্রপট। চার-পাঁচজন একসঙ্গে হুড়মুড় করে উঠে দাঁড়াতেন। “আপা, এখানে বসেন”, “খালাম্মা, আমার সিটে আসেন”—এমন ডাকাডাকিতে মুখর হয়ে উঠত চারপাশ। শ্রদ্ধা থেকে হোক, কিংবা নিছক লোক দেখানো সস্তা বাহবা কুড়ানোর লোভে হোক, আসন ছেড়ে দেওয়ার এক নীরব প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত।
কিন্তু একজন পুরুষ, একজন কর্মক্ষম বয়সের পুরুষ যখন তীব্র ব্যথায় এক পায়ে ভর দিয়ে কাঁপতে থাকেন, যখন তার চোখের কোণে জমে ওঠা জল আমরা দেখেও দেখি না, তখন আমাদের সমস্ত দয়া, সমস্ত মমতা কর্পূরের মতো উবে যায় কেন? কেন আমাদের বিবেক তখন নাক ডেকে ঘুমায়? পুরুষ বলেই কি তার কষ্টের কোনো রং নেই, কোনো ওজন নেই? আমাদের সমাজ কি তবে পুরুষকে কেবলই এক যন্ত্র ভাবে—যার ক্লান্তি নেই, যার ব্যথা নেই, যার চোখে জল মানায় না? আমাদের মানবিকতা কি তবে এখন লিঙ্গ, বয়স, পোশাক আর সামাজিক অবস্থান মেপে বিতরণ করা হয়?
“সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই”—মহাজন চণ্ডীদাসের এই অমর বাণী আমরা ছেলেবেলা থেকে পড়ে আসছি। পরীক্ষার খাতায় লিখে নম্বর পেয়েছি, বক্তৃতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে গলা কাঁপিয়ে আবৃত্তি করেছি। ফেসবুকের প্রোফাইলে বায়ো দিয়ে নিজেদের প্রগতিশীল প্রমাণ করেছি। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন, রুক্ষ মাটিতে দাঁড়িয়ে সেই মহান বাণীকে আমরা প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে পদদলিত করি। আমরা ভুলে যাই, আসনের সামনে দাঁড়ানো মানুষটিরও একটি পরিচয় আছে—তিনি প্রথমত এবং শেষ পর্যন্ত একজন ‘মানুষ’।
এই শহরের যান্ত্রিক কোলাহল, এই ইঁদুর-দৌড়ের জীবন আমাদের ধীরে ধীরে অনুভূতিহীন রোবটে পরিণত করছে। আমাদের চোখ আছে, কিন্তু সেই চোখে মায়া নেই। আমাদের কান আছে, কিন্তু সেই কানে অন্যের দীর্ঘশ্বাস পৌঁছায় না। আমাদের হৃদয় আছে, কিন্তু সেই হৃদয়ে অন্যের জন্য জায়গা নেই। আমরা সবাই নিজের নিজের ছোট্ট পৃথিবীতে বন্দি। আমার আসন, আমার আরাম, আমার ফোন—এই আমার-এর বাইরে আমরা কিছুই ভাবতে পারি না।
একটি আসন ছেড়ে দেওয়া আহামরি কোনো ত্যাগ নয়। এর জন্য নোবেল পুরস্কার পাওয়া যায় না। এটি কেবল একটুখানি মনোযোগ, এক ফোঁটা সহমর্মিতা, এক মুহূর্তের জন্য নিজের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা। কিন্তু এই শহরের ইট-পাথরের দেয়াল আমাদের মনকেও কঠিন করে দিয়েছে। আমরা ভুলে গেছি যে পাশের সিটে বসা বা সামনে দাঁড়ানো মানুষটাও আমারই মতো রক্তমাংসের মানুষ।
এই ছবিটি তাই কেবল একজন অসুস্থ, অসহায় মানুষের ছবি নয়। এটি আমাদের সম্মিলিত বিবেকের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট। এটি আমাদের শিক্ষার, আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধের, আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার এক নির্মম ব্যর্থতার দলিল। এটি আমাদের প্রত্যেকের বিবেকের কাছে রেখে যাওয়া এক নিঃশব্দ, কিন্তু তীক্ষ্ণ প্রশ্ন—এই ঝকঝকে মেট্রোরেল, এই উড়ালসড়ক, এই আকাশছোঁয়া অট্টালিকা দিয়ে আমরা যদি একটি সহানুভূতিশীল মানুষই তৈরি করতে না পারলাম, তবে এই তথাকথিত উন্নয়ন দিয়ে কী হবে?
যেদিন আমরা একজন পুরুষের চোখের জলকেও একজন নারীর চোখের জলের মতোই মূল্য দিতে শিখব, যেদিন আমরা লিঙ্গ, বয়স, পরিচয় ভুলে শুধু একজন কষ্ট পাওয়া ‘মানুষ’কে দেখতে শিখব, যেদিন আমাদের আসন ছেড়ে দেওয়ার জন্য কোনো নিয়ম বা সাইনবোর্ডের দরকার পড়বে না—সেদিন হয়তো এই শহরটা একটু কম যান্ত্রিক হবে, একটু বেশি মানবিক হবে। সেদিন হয়তো চণ্ডীদাসের বাণী কাগজের পাতা থেকে নেমে এসে আমাদের শিরায় শিরায় প্রবাহিত হবে।
তার আগ পর্যন্ত, আমরা সবাই এই নির্মম নীরবতার, এই পাশবিক উদাসীনতার অংশীদার। আমরা সবাই আসামি, এই মানুষটার প্রতিটি কষ্টের, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসের।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।