অতিচিন্তার অবসাদ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | মার্চ ০২, ২০২৬
গত মাসে রাত দুইটার দিকে ঘুম ভেঙে গেল। কোনো দুঃস্বপ্ন না, বাইরে কোনো শব্দও না। শুধু মাথার ভেতর একটা প্রশ্ন—আমি কি ঠিকমতো বাঁচছি?
তারপর শুরু হলো প্রশ্নের মিছিল। কেন এই কাজ করছি। মানুষ আমাকে কীভাবে দেখে। আমি নিজেকে কীভাবে দেখি। মনে হচ্ছিল, মাথার ভেতর কেউ পুরোনো আলমারি খুলে সব কাপড় মেঝেতে ছুড়ে দিয়েছে। গুছোতে পারছি না।
ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছিল। আমি না।
সকালে মা জিজ্ঞেস করলেন, "ঘুম হয়েছিল?"
বললাম, "হ্যাঁ, ভালো।"
কথাটা বলেই টের পেলাম—এটা উত্তর না, অভ্যাস। ভালো মানে কী? মাথা শান্ত? বুক হালকা? না। শুধু সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য একটা শব্দ।
আমরা এখন অনুভূতির ভাষা জানি। কিন্তু অনুভূতির পাশে বসে থাকার ধৈর্য হারিয়েছি।
ঢাকার জ্যামে বসে থাকলে দেখি—সবাই ফোনে। কিন্তু আসল জ্যামটা ভেতরে। এত ভাবি, এত বিশ্লেষণ করি যে নিজের ভেতরের ছোট্ট কণ্ঠটা হারিয়ে যায়। আগে দুঃখ পেলে মানুষ হাঁটতে বের হতো, বা বন্ধুর কাছে যেত। এখন আমরা আগে খুঁজি—"আমার সমস্যার নাম কী?"
আমার এক বন্ধু আছে। সে প্রতিটা সম্পর্ক শুরু করার আগে নিজের মানসিক গঠন নিয়ে পড়ে—সংযুক্তির ধরন, শৈশবের প্রভাব, আচরণের ধারা। সব জানে। কিন্তু কোনো সম্পর্কেই এগোতে পারে না। কারণ সে আগেই ধরে নিয়েছে—ভাঙবে।
জ্ঞান তাকে সতর্ক করেছে। সাহস দেয়নি।
একদিন সে বললো, "আমি সংযুক্তি তত্ত্ব পড়েছি। আমার উদ্বিগ্ন-এড়িয়ে চলা ধরন আছে। তাই প্রতিশ্রুতিতে যেতে পারি না।"
আমি শুনলাম। তারপর বললাম, "কিন্তু তুমি কী অনুভব করছ এখন?"
সে চুপ হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর বললো, "জানি না। ভয়... মনে হয়।"
ওই "জানি না"টা—সেটাই আসল কথা ছিল। বাকি সব ছিল ব্যাখ্যা।
মুরাকামির উপন্যাসে—নরওয়েজিয়ান উড বা কাফকা অন দ্য শোর—চরিত্রগুলো নিজের ভেতরের করিডোরে হাঁটে। একটা দরজা খুলে আরেকটা দরজা পায়। তারপর আরেকটা। শেষ নেই।
পড়তে পড়তে কখনো মনে হয়, এই করিডোরটা আমারই।
কিন্তু মুরাকামির চরিত্ররা একটা জিনিস করে—তারা হাঁটে। থেমে থাকে না। জানে না কোথায় যাচ্ছে, কিন্তু হাঁটা থামায় না।
আমরা অনেকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বিশ্লেষণ করতে থাকি—ভেতরে কী আছে, খুললে ঠিক হবে কি না, দরজাটার রং কেন এমন। হাঁটাটা ভুলে যাই।
শেকসপিয়ারের হ্যামলেটকে আমরা দ্বিধাগ্রস্ত বলি। কিন্তু তার সমস্যা দ্বিধা না—সিদ্ধান্তের আগে নিখুঁততার দাবি। সে চায় সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাক। প্রমাণ চায়, নৈতিক নিশ্চয়তা চায়।
আর সেই অপেক্ষায় তার চারপাশের মানুষ মরে যায়। নিজেও।
আমি নিজেও এই ফাঁদে পড়েছি। একটা লেখা লিখব বলে তিনদিন শুধু নোট বানালাম। কাঠামো ঠিক। উদাহরণ ঠিক। যুক্তি ঠিক।
শেষে দেখি—কাগজ ফাঁকা।
হয়তো অতিরিক্ত নিখুঁত হতে গিয়ে শুরুটাই হারিয়ে ফেলি। বা হয়তো আমি নিজেকে বোকা বানাচ্ছি—ভয়টা ঢাকতে পরিপূর্ণতার দোহাই দিচ্ছি।
এই সমস্যাটা শুধু ব্যক্তিগত না, সামাজিকও। এখন দুঃখেরও একটা ভঙ্গি আছে। কেউ কষ্ট পেলে আগে নিজের গল্প বলে না, সমস্যার নাম বলে।
"আমার বিষণ্নতা আছে।"
"আমার উদ্বেগজনিত সমস্যা আছে।"
এতে ভুল নেই। নাম জানা দরকার। কিন্তু শুধু নাম বললে দূরত্ব তৈরি হয়। কষ্টটা তখন স্পর্শ করা যায় না, শুধু শ্রেণিবদ্ধ করা যায়।
আমার দাদু পড়াশোনা জানতেন না। কিন্তু কারও মৃত্যুতে তার কান্না ছিল কাঁচা। সেখানে কোনো পরিভাষা ছিল না, তবু গভীর ছিল।
আমরা এখন অনেক শব্দ জানি। কিন্তু সেই কাঁচা অনুভূতি—যেখানে কোনো ব্যাখ্যা নেই, শুধু উপস্থিতি—সেটা কোথায় যেন আটকে যায়।
আমি জানি রাতে দেরি করে ফোন দেখলে মাথা ভার লাগে। তবু দেখি।
আমি জানি কিছু সম্পর্ক আমাকে ক্ষয় করে। তবু ছাড়তে দেরি করি।
জানা আর বদলানো আলাদা জিনিস।
একবার এক মনোচিকিৎসক বলেছিলেন, "আপনি নিজের সমস্যা খুব ভালো ব্যাখ্যা করতে পারেন। কিন্তু কখন শেষবার কেঁদেছিলেন?"
আমি উত্তর দিতে পারিনি।
সব প্রশ্নের উত্তর দরকার—এই ধারণাটাই হয়তো সবচেয়ে বড় ক্লান্তি। কিছু প্রশ্নকে রেখে দিতে হয়। জীবন সবসময় পরিষ্কার না।
কখনো সম্পর্ক ভাঙে, কোনো বড় নাটক ছাড়া। কখনো স্বপ্ন বদলে যায়। কারণ আমরা বদলাই।
কখনো কোনো কারণও খুঁজে পাই না। শুধু দেখি বদলে গেছে।
আর সেটা মেনে নেওয়াটাও একটা দক্ষতা।
কিছুদিন আগে এক পুরনো বন্ধুকে ফোন করলাম। কোনো পরিকল্পনা ছিল না। আমরা কলেজের গল্প করলাম, পুরনো শিক্ষক নিয়ে হাসলাম।
ফোন রাখার পর মনে হলো—এই হাসির কোনো বিশ্লেষণ দরকার হয়নি। হাসিটা ছিল। বুকটা হালকা লাগলো। এই অনুভূতির কোনো নাম লাগেনি।
সেই মুহূর্তটা মনে করিয়ে দিলো—কিছু জিনিস শুধু থাকলেই হয়। বোঝার দরকার নেই।
কখনো শুধু বলা—"আমি ভয় পাচ্ছি"—এটাই শুরু।
বা—"আমি জানি না।"
এই স্বীকারোক্তিতে দুর্বলতা নেই। আছে সততা।
আমি এখনও রাতে জেগে থাকি কখনো কখনো। প্রশ্নগুলো এখনও আসে। কিন্তু এখন আর সবগুলোর উত্তর খুঁজি না।
কিছুদিন ঠিক লাগে। আবার কিছুদিন... শুধু লাগে না।
হয়তো বাঁচা মানে সব বোঝা না। হয়তো মানে ভুল করা। হয়তো মানেই—এখনও পুরোটা ধরা পড়েনি। বাকিটা পথে।
আজ সকালে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখলাম—রোদ উঠছে। এতে কোনো গভীর অর্থ নেই। প্রতিদিন রোদ ওঠে।
কিন্তু আজকে দেখলাম। এটুকুই।
হয়তো বেঁচে থাকা এভাবেই—একটা মুহূর্ত ধরা পড়ে, আরেকটা হাতছাড়া হয়। একটা বোঝা যায়, আরেকটা শুধু অনুভব করা যায়।
তবু... বেঁচে থাকা কি কোনোদিন সত্যিই মসৃণ ছিল?
না। কখনো ছিল না।
আর সেটাই হয়তো স্বাভাবিক।
[শেষ]
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।