বাল্যবিবাহ শিশু স্ত্রীর অন্ধকার জীবন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। এপ্রিল ০১, ২০২৬
একটা ১১ বছরের মেয়েকে লাল শাড়ি পরিয়ে সিঁদুর পরিয়ে ‘সুখের সংসার’ বানানোর নামে আমরা যে অপরাধটা এখনও চালিয়ে যাচ্ছি, সেটাকে সত্যি বিয়ে বলা যায়?”
এই প্রশ্ন মনে আসলেই বুকটা ভারী লাগে। বাংলা সাহিত্য এই সত্য থেকে চোখ ফেরায়নি। বরং জোর করে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে — একটা শিশুর শরীর, মন আর ভবিষ্যৎ কীভাবে নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে যায় যখন সমাজ তাকে জোর করে স্ত্রীর ভূমিকায় ঠেলে দেয়।
রবীন্দ্রনাথের ‘সমাপ্তি’ গল্পটা পড়লে এখনও মন খারাপ হয়। এখানে মৃন্ময়ী — এক দুরন্ত, খেলাধুলোয় মেতে থাকা মেয়ে। পুতুল নিয়ে খেলে, গ্রামের ছেলেদের সাথে দাপিয়ে বেড়ায়। কিন্তু হঠাৎ একদিন তাকে অপূর্বর সাথে বিয়ে দিয়ে স্বামীর ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মৃন্ময়ী বুঝতেই পারে না কেন তার জীবনটা এত হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। অপূর্ব প্রথমে বিরক্ত হয়, পরে তার সারল্য আর শৈশবের উচ্ছ্বাস তাকে ছুঁয়ে যায়। কিন্তু সমাজের চাপে তাদের সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ এখানে ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ সংকটটাকে তুলে ধরেছেন — অসময়ে একটা শিশুকে বড় করে ফেললে দুজনের আত্মাই আহত হয়।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাল্যবিবাহের যন্ত্রণা আরও নিষ্ঠুরভাবে ফুটিয়েছেন, বিশেষ করে ‘ক্ষুদিতোষ্ণ’ গল্পে। সেখানে অকাল বিয়ে হওয়া কিশোরীটির দুঃখ পাঠককে সত্যি নাড়া দেয়। তিনি দেখিয়েছেন খেলার বয়সেই মেয়েদের ওপর সংসারের দায়িত্ব কীভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়। অনেক সময় এই মেয়েরা অকালে বিধবা হয়, স্বামীর ঘরে নির্যাতন সহ্য করে, কিংবা সমাজের চোখে ‘অপয়া’ হয়ে যায়। শরৎচন্দ্র কখনো রং চড়াননি। তিনি সরাসরি, নির্মম বাস্তবতা লিখেছেন — যেখানে একটা মেয়ের শৈশব রান্নাঘরের ধোঁয়া আর শ্বশুরবাড়ির চাপে নিভে যায়। এখানে তিনি সামাজিক অসমতা আর প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ঠুরতার ছবি এঁকেছেন।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় গ্রামীণ বাস্তবতা আরও নগ্ন হয়ে ওঠে। ‘পথের পাঁচালী’সহ তাঁর বিভিন্ন গল্পে দেখা যায়, গ্রামের ছোট মেয়েরা কীভাবে খুব অল্প বয়সেই সংসারের চাকায় বাঁধা পড়ে। তাদের শরীর তখনও পরিপূর্ণ হয়নি, কিন্তু সমাজ তাদের কাছে মা হওয়ার দাবি করে বসে। ফলে অকাল মৃত্যু, শারীরিক জটিলতা আর মানসিক ভাঙন। বিভূতিভূষণ প্রকৃতির সাথে মানুষের লড়াইয়ের পাশাপাশি এই অদৃশ্য লড়াইটাও দেখিয়েছেন।
তিন লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন ব্যক্তির আত্মার সংকট — অপূর্ব আর মৃন্ময়ীর মধ্যে অসম্পূর্ণ বোঝাপড়া। শরৎচন্দ্র দেখিয়েছেন সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ঠুরতা। আর বিভূতিভূষণ দেখিয়েছেন প্রকৃতির নির্মমতার সাথে মানুষের নির্মমতার সূক্ষ্ম পার্থক্য। কিন্তু তিনজনেই একটা কথা বলেছেন — বাল্যবিবাহ শুধু শরীর নয়, একটা পুরো জীবনকে অসময়ে ভেঙে দেয়।
আজকের বাংলাদেশে আইন আছে। বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ। কিন্তু আইন কি গ্রামের অন্ধকার ঘরে পৌঁছায়? এখনও “মেয়ের বয়স হয়ে গেছে, এখন না বিয়ে দিলে পরে কী হবে” — এই যুক্তিতে মেয়েদের জোর করে স্বামীর ঘরে পাঠানো হয়। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০-২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এখনও ৫১ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছরের আগে। শহরেও ধর্ম, সম্মান আর “ভালো ঘর” এর নামে এই প্রথা লুকিয়ে চলে। মেয়েটা পড়াশোনা করতে চায়, খেলতে চায়, স্বপ্ন দেখতে চায় — কিন্তু তার আগেই তার শৈশব শেষ করে দেওয়া হয়।
আমি নিজের চোখে দেখেছি এমন অনেক মেয়েকে। তাদের চোখে একটা ফাঁকা দৃষ্টি থাকে। হাসিটা পুরো হয় না। কথা বলার সময় গলায় একটা লুকানো ভয় থাকে। এই অসহায়তা শুধু সাহিত্যের পাতায় আটকে নেই, আজও আমাদের সমাজের রক্তে মিশে আছে।
এটা আসলে সামাজিকতার নীরব ভাঙন। যে সমাজ তার শিশুদের শৈশব কেড়ে নেয়, সে নিজেই ভাঙতে থাকে। সাহিত্য আমাদের সেই ভাঙনের দিকে আঙুল তুলে দেয়।
আজ এই লেখা পড়ে যদি আমরা শুধু “ভালো লাগলো” বলে চলে যাই, তাহলে কোনো লাভ হবে না। পরিবারে, সমাজে, গ্রামে আমাদের কথা বলতে হবে। মেয়েদের পড়াশোনা আর শৈশবের অধিকার নিয়ে জোরালো আওয়াজ তুলতে হবে।
তোমার কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে এই বিষয়ে? অথবা সাহিত্যের কোন চরিত্র তোমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে? কমেন্টে খুলে বলো। তোমার একটা কথাও হয়তো কারো চোখ খুলে দিতে পারে।
আমাদের মেয়েদের শৈশব ফিরিয়ে দিতে হবে। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায় — নাহলে সাহিত্যের সেই সব মেয়েরা, মৃন্ময়ী, ক্ষুদিতোষ্ণের কিশোরী, পথের পাঁচালীর দুর্গারা আমাদেরই চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করবে — তোমরা পড়লে, বুঝলে, কিন্তু বদলাতে পারলে না?
#বাল্যবিবাহ #শিশুস্ত্রী #সামাজিকভাঙন #বাংলাসাহিত্য #নারীঅধিকার
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।