চেয়ারের সম্মান
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী
১৮ জুলাই, ২০২৬
একই মানুষ। গতকাল যার ঘরে ঢুকতে অনুমতি লাগত, আজ তিনি অবসরে। মানুষটা একটুও বদলাননি। বদলেছে শুধু তাঁর চেয়ারটা। আর সেই সঙ্গে বদলে গেছে অনেকের ব্যবহার।
এই দৃশ্য আমরা সবাই দেখি, কিন্তু খুব কম মানুষ তা নিয়ে কথা বলি।
আমরা মুখে বলি, মানুষকে সম্মান করি। কিন্তু একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, আমরা অনেক সময় মানুষকে নয়, তার অবস্থানকে সম্মান করি। যতদিন কারও হাতে ক্ষমতা থাকে, ততদিন তাঁর চারপাশে মানুষের অভাব হয় না। ফোন বাজে, নিমন্ত্রণ আসে, সবাই খোঁজ নেয়। মনে হয়, তাঁকে ছাড়া কিছুই চলবে না।
তারপর একদিন পদটা থাকে না। অবসর আসে, দায়িত্ব বদলে যায়, ক্ষমতা অন্য কারও হাতে চলে যায়। তখন যেন সব একসঙ্গে বদলে যায়। ফোন কমে আসে। খোঁজ নেওয়ার মানুষগুলো হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কেউ কেউ এমনভাবে পাশ কাটিয়ে যায়, যেন কোনোদিন পরিচয়ই ছিল না।
তখন মনে প্রশ্ন জাগে, মানুষটা কি বদলে গেছেন?
না, মানুষটা একই আছেন। বদলেছে শুধু তাঁর পরিচয়পত্র। আর সেই পরিচয়ের সঙ্গেই বদলে গেছে আমাদের আচরণ।
এই বাস্তবতা শুধু অফিস বা রাজনীতিতে নয়, পরিবারেও আছে। যতদিন একজন মানুষের হাতে রোজগার থাকে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকে, ততদিন তাঁর কথার গুরুত্ব থাকে। সেই অবস্থাটা বদলে গেলেই অনেক সম্পর্কের আসল চেহারা বেরিয়ে আসে। তখন বোঝা যায়, মানুষটার জন্য নয়, তাঁর প্রয়োজনেই সম্পর্কটা টিকে ছিল।
আজকাল কাউকে চিনতে গিয়েই আমরা প্রথমে জানতে চাই, তিনি কী করেন, কোথায় চাকরি করেন, কত টাকা আয় করেন, কতটা প্রভাবশালী। খুব কম মানুষ জানতে চায়, তিনি কেমন মানুষ। তিনি সৎ কি না, বিনয়ী কি না, বিপদে অন্যের পাশে দাঁড়ান কি না। চরিত্রের আগে পরিচয়, মানুষের আগে পদ, এই হিসাবটাই এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই অভ্যাসটা আমাদের নিজেদের ভেতরেও ঢুকে গেছে। প্রভাবশালী কাউকে দেখলে আমরা নিজের অজান্তেই বদলে যাই। কথা বলার ভঙ্গি বদলে যায়, হাঁটাচলাও বদলে যায়। অথচ একজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে সেই একই সম্মান দেখাতে গিয়ে আমরা কৃপণতা করি।
তাহলে এই চক্র থেকে বের হব কীভাবে?
প্রথমে একটা সত্য মেনে নিতে হবে, চেয়ার চিরকাল থাকে না। ক্ষমতা থাকে না। টাকাও সবসময় একরকম থাকে না। কিন্তু একজন মানুষ অন্যের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করেছিলেন, সেটা মানুষ বহু বছর মনে রাখে।
তাই মানুষকে তার পদবি দিয়ে নয়, তার ব্যবহার দিয়ে বিচার করতে শিখতে হবে। যে মানুষটা আজ আপনার কোনো উপকার করতে পারবে না, তার সঙ্গেও যদি আপনি একই সম্মান নিয়ে কথা বলতে পারেন, সেটাই প্রকৃত ভদ্রতা। সেটাই আপনার পরিচয়।
দ্বিতীয়ত, এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে যা প্রয়োজনের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। যেখানে মানুষটার জন্যই খোঁজ নেওয়া হয়, তার পদের জন্য নয়। কারণ প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে যে সম্পর্ক ফুরিয়ে যায়, সেটা সম্পর্ক নয়, সেটা লেনদেন।
একজন মানুষকে সত্যি চিনতে চাইলে তাকে তখন দেখুন, যখন তার হাতে কোনো ক্ষমতা নেই। আর একটা সম্পর্ককে চিনতে চাইলে দেখুন, প্রয়োজন শেষ হওয়ার পরও সেটা টিকে আছে কি না।
শেষ পর্যন্ত মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পদ নয়, তার চরিত্র। চেয়ার একদিন অন্য কারও হয়ে যায়। ক্ষমতা একদিন ফুরিয়ে যায়। কিন্তু ভালো ব্যবহার মানুষের মনে থেকে যায়, আর অবহেলাও মানুষ সহজে ভোলে না।
আমরা সবাই জীবনের কোনো না কোনো সময় চেয়ার হারাব। সেদিন যদি দেখি, মানুষ হারিয়ে যায়নি, দু-চারজন মানুষ নিঃস্বার্থভাবে পাশে আছে, সেটাই হবে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।