আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সত্য গল্প
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
লেখক ও সাহিত্য গবেষক |
বিশ্লেষণধর্মী কলাম। ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬
ফেব্রুয়ারির ভোরে ঢাকার আকাশে এক ধরনের নীলচে কুয়াশা থাকে। সেই কুয়াশার মধ্যেই ১৯৫২ সালের এক সকালে –এর সামনে জড়ো হয়েছিল কিছু তরুণ। তাদের হাতে ছিল বই, ব্যাগ, আর কিছু হাতে লেখা প্ল্যাকার্ড। তারা জানত না কয়েক ঘণ্টা পরে ইতিহাস তাদের নাম মনে রাখবে; তারা শুধু জানত, নিজের ভাষায় কথা বলার অধিকার চাই।
আজ আমরা সেই দিনকে স্মরণ করি ফুল দিয়ে, শোক দিয়ে, স্লোগান দিয়ে। কিন্তু সত্য গল্পটি ফুলের নয়—অভ্যাসের। ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস শহীদের রক্তে লেখা হলেও, তার ভবিষ্যৎ লেখা হয় প্রতিদিনের ব্যবহারে।
ইতিহাসের সত্য প্রেক্ষাপট
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন কোনো হঠাৎ আবেগের বিস্ফোরণ ছিল না। পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত নিলে পূর্ব বাংলার মানুষ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল করে; পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আবদুল জব্বার, রফিক, বরকত, সালামসহ আরও অনেকে।
এই ঘটনাই পরবর্তীতে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা এনে দেয় এবং বহু বছর পরে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
কিন্তু ইতিহাস এখানেই শেষ নয়। আসল প্রশ্ন—আমরা সেই অর্জনকে কীভাবে ব্যবহার করছি?
ভাষার সংকট কোথায়?
আমরা ভাবি ভাষা শুধু স্কুলের বিষয়, কবিতার বিষয়, বইমেলার বিষয়। বাস্তবে ভাষা হলো অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু।
বাংলাদেশে ইংরেজি মিডিয়াম শিক্ষার বিস্তার গত দুই দশকে দ্রুত বেড়েছে। অভিভাবকরা মনে করেন ইংরেজি মানেই ভালো ভবিষ্যৎ। এটা পুরো ভুল নয়—কারণ চাকরির বাজারে ইংরেজির চাহিদা আছে। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন ইংরেজি শেখার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভুলে যাওয়াকে আধুনিকতা মনে করা হয়।
আমি এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের কথা বলি। তাঁর ছেলে ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ে। ছেলেটি বাংলা পড়তে অস্বস্তি বোধ করে। শিক্ষকটি গবেষণা করেন বাংলার ইতিহাস নিয়ে, কিন্তু নিজের সন্তানের সঙ্গে ভাষার দূরত্ব মাপতে পারেন না। এই দ্বৈততা শুধু এক পরিবারের নয়—হাজার পরিবারের।
ঢাকার এক ক্যাফেতে বসে শুনেছিলাম, তিন বন্ধু নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে কথা বলছে, কারণ “বাংলায় বললে লোকে শুনবে না।” এই মনস্তত্ত্বই ভাষার আসল সংকট—লজ্জা।
প্রযুক্তির যুগে ভাষার লড়াই
ভাষা এখন শুধু বইয়ে নয়, স্ক্রিনে বাঁচে।
গুগলে বাংলায় সার্চ করলে ফলাফল কম আসে, বাংলা উইকিপিডিয়ার নিবন্ধ সংখ্যা এখনও ইংরেজির তুলনায় অনেক কম, অনেক সফটওয়্যারে বাংলা ইন্টারফেস নেই। যে ভাষা প্রযুক্তিতে নেই, সে ভাষা ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে পিছিয়ে পড়ে।
ভাষা আন্দোলনের শহীদরা শুধু উচ্চারণের অধিকার চাননি—চেয়েছিলেন সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা। আজ সেই স্বাধীনতা নির্ভর করছে ডিজিটাল কনটেন্টের উপর।
যদি বাংলা ভাষায় গবেষণা, বিজ্ঞান, ব্যবসা, প্রযুক্তি নিয়ে লেখা না বাড়ে, তাহলে মাতৃভাষা দিবস স্মৃতির দিন হয়ে যাবে—বাস্তবতার নয়।
শহর বনাম গ্রামের ভাষা
গ্রামে গেলে এখনও ভাষার প্রাণ দেখা যায়। এক চাচা আছেন—পঞ্চাশ বছর ধরে জমি চাষ করেন। তাঁর কথায় ধানের গন্ধ, বৃষ্টির শব্দ, মাটির শব্দ। সেই শব্দ অভিধানে নেই, কিন্তু অর্থে পূর্ণ।
কিন্তু তাঁর নাতি শহরে পড়ে এসে সেই ভাষা বুঝতে পারে না। এই দূরত্ব শুধু প্রজন্মের নয়—সংস্কৃতির।
যখন শহর গ্রামের ভাষাকে তুচ্ছ করে, তখন ভাষা ভাঙে।
শহীদ মিনারের সামনে সত্য প্রশ্ন
আমরা প্রতি বছর –এ ফুল দিই। কিন্তু ফুলের সঙ্গে কি আমরা ভাষা ব্যবহার করি?
অফিসে সবাই বাঙালি হয়েও ইংরেজি ই-মেইল লিখি।
বাংলা বই কিনি না।
বাংলায় লিখলে “প্রফেশনাল” মনে হয় না।
এই ছোট ছোট সিদ্ধান্তই ভাষাকে দুর্বল করে।
শহীদরা আমাদের কাছে ফুল চাননি—চেয়েছিলেন আত্মমর্যাদা।
ভাষা রক্ষার বাস্তব পথ
ভাষা রক্ষা কোনো আবেগ নয়—কৌশল।
প্রথমত, শিক্ষায় ভারসাম্য।
ইংরেজি শিখব, কিন্তু বাংলা পড়া বন্ধ করব না। সাহিত্য নয়, বিজ্ঞান–অর্থনীতি–আইন—সব বিষয়ে বাংলা লেখা বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিতে বাংলা।
বাংলায় ব্লগ, উইকিপিডিয়া, ইউটিউব কনটেন্ট বাড়াতে হবে। যে ভাষায় জ্ঞান নেই, সে ভাষায় শক্তি নেই।
তৃতীয়ত, অর্থনীতিতে বাংলা।
বিজ্ঞাপন, সফটওয়্যার, ব্যবসার নথিতে বাংলা ব্যবহার বাড়াতে হবে। ভাষা তখনই বাঁচে, যখন সে আয় তৈরি করে।
সত্য গল্পের শেষ কথা
ভাষা আন্দোলনের সত্য গল্প শুধু অতীতের রক্ত নয়—বর্তমানের সিদ্ধান্ত।
আমরা যদি বাংলায় চিন্তা করি, বাংলায় লিখি, বাংলায় সৃষ্টি করি—তবেই শহীদদের স্বপ্ন বাঁচবে।
না হলে একদিন শহীদ মিনারে ফুল থাকবে, কিন্তু ভাষা থাকবে না।
ফেব্রুয়ারির কুয়াশা এখনও নামে। প্রশ্ন একটাই—
আমরা কি নিজের ভাষায় দাঁড়াতে প্রস্তুত?
#আন্তর্জাতিক_মাতৃভাষা_দিবস #ভাষা_আন্দোলন #বাংলা_ভাষা #২১শে_ফেব্রুয়ারি #বাংলা_সাহিত্য
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।