রামিসার পরেও আমরা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ২০ মে, ২০২৬
একটা সমাজের ভেতরে কতটা অন্ধকার জমলে সাত বছরের একটা শিশুও নিরাপদ থাকে না?
প্রশ্নটা আবেগের, অবশ্যই। কিন্তু শুধু আবেগের না। এটা আমাদের সামাজিক অভ্যাস, নীরবতা আর ব্যর্থতার প্রশ্নও। কারণ ঘটনাগুলো আলাদা দেখালেও, ভেতরের কাঠামোটা প্রায় একই থাকে। একটা শিশু সকালে ছিল। স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল। নতুন ক্লাসের বইয়ে হয়তো নিজের নাম লিখেছিল বাঁকা হাতের অক্ষরে। তারপর কয়েক ঘণ্টা পর সে পরিণত হয় ব্রেকিং নিউজে।
এরপর আমরা যা করি, সেটাও প্রায় নির্দিষ্ট। ক্ষোভ। শোক। বিচার দাবি। কয়েকদিন সামাজিক মাধ্যমে উত্তেজনা। তারপর নতুন কোনো ঘটনা এসে পুরোনো ক্ষতটাকে সরিয়ে দেয়। শুধু একটা পরিবার আটকে থাকে সেই সকালটার ভেতর—যে সকাল থেকে তাদের জীবন আর কখনো স্বাভাবিক হবে না।
রামিসার বয়স ছিল সাত। দ্বিতীয় শ্রেণিতে উঠেছিল। এই বয়সের শিশুরা পৃথিবীকে ভয় পেতে শেখে না আগে; তারা বিশ্বাস করতে শেখে। পাশের বাসার মানুষকে নিরাপদ ভাবে। পরিচিত মুখ দেখলে দরজা খুলে দেয়। বড়দের কথা সহজে মেনে নেয়। একটা সমাজ আসলে শিশুদের এই সরল বিশ্বাসের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে। আর সেই বিশ্বাস যখন ভেঙে যায়, তখন ক্ষতিটা শুধু একটা পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সমাজও সেখানে কিছু হারায়।
সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটা অন্যখানে। এমন খবর এখন আর আমাদের পুরোপুরি বিস্মিত করে না। আতঙ্কিত করে, কিন্তু বিস্মিত না। এই পার্থক্যটা ছোট না। কারণ কোনো সমাজ যখন ভয়াবহতার সঙ্গে বারবার বসবাস করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন তার ভেতরে এক ধরনের নৈতিক অসাড়তা তৈরি হয়। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগজনক হারে ঘটছে। মানুষ খবর পড়ে। থামে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর স্ক্রল করে নিচে নেমে যায়।
ঘটনার বিবরণগুলোও কেমন পরিচিত লাগে। শিশু নিখোঁজ। মা খুঁজছেন। পাশের ফ্ল্যাটের সামনে জুতা পড়ে আছে। দরজায় ধাক্কা। তারপর হঠাৎ বিশৃঙ্খলা। একজন মানুষ গ্রিল কেটে পালাচ্ছে। এগুলো সিনেমার দৃশ্য না। আমাদের শহুরে জীবনের বাস্তবতা। একই ভবনে মানুষ বছরের পর বছর থাকে, অথচ একে অন্যের জীবন সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানে না। এই নীরবতা আর উদাসীনতা অপরাধীদের জন্য নিরাপদ অন্ধকার তৈরি করে।
আর তারপর আসে সবচেয়ে কঠিন তথ্যগুলো। নির্যাতনের পর হত্যাও যথেষ্ট ছিল না; মরদেহ বিকৃত করার মতো নিষ্ঠুরতাও ঘটেছে। অভিযোগ উঠেছে, সেখানে সহযোগী ছিল আরেকজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। এখানেই ঘটনাটা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় হয়ে থাকে না। এটা মানুষের অনুভূতি, নৈতিকতা আর সামাজিক অবক্ষয়ের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
আমরা প্রায়ই স্বস্তির জন্য অপরাধীকে “দানব” বলে আলাদা করি। এতে একটা সুবিধা আছে। তাহলে মনে হয়, সমস্যা সমাজে না; সমস্যা শুধু ওই মানুষটার মধ্যে। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল না। কারণ সহিংসতা হঠাৎ তৈরি হয় না। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, নারীর প্রতি বিকৃত দৃষ্টিভঙ্গি, শিশুদের প্রতি কর্তৃত্ববাদী আচরণ—এসব একসঙ্গে একটা বিপজ্জনক পরিবেশ তৈরি করে।
প্রতিটি ঘটনার পর আমরা কঠোর শাস্তির কথা বলি। সেই দাবি প্রয়োজনীয়। কিন্তু শুধু শাস্তির ভাষা দিয়ে সমস্যার শেষ ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন। কারণ অপরাধের পর আমরা যতটা উচ্চকণ্ঠ হই, অপরাধের আগে ততটা সতর্ক হই না।
শিশু নিরাপত্তা নিয়ে পরিবারে খোলামেলা কথা হয় খুব কম। “খারাপ স্পর্শ” বা ব্যক্তিগত সীমানা নিয়ে আলোচনা এখনো অনেকের কাছে অস্বস্তিকর। ফলে শিশুরা বিপদ চিনতে শেখার আগেই বিপদের মুখোমুখি হয়ে যায়। স্কুলগুলোর অবস্থাও খুব আলাদা না। পরীক্ষার চাপ আছে, কোচিং আছে, রেজাল্টের প্রতিযোগিতা আছে। কিন্তু শিশুদের নিরাপত্তা শিক্ষা? মানসিক সহায়তা? আচরণগত ঝুঁকি চিহ্নিত করার ব্যবস্থা? সেগুলো প্রায় অনুপস্থিত।
আমরা শিশুদের গণিত শেখাই, ইংরেজি শেখাই, কিন্তু ভয় পেলে কী করতে হবে—সেটা শেখাতে দেরি করি।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, একটা শিশুর মৃত্যুর পরও আমরা দ্রুত বিভক্ত হয়ে যাই। কেউ রাজনৈতিক ব্যাখ্যা খোঁজে, কেউ সামাজিক মাধ্যমের তর্কে নেমে পড়ে। অথচ সাত বছরের একটা শিশুর কোনো মতাদর্শ ছিল না। তার পৃথিবী খুব ছোট ছিল। একটা স্কুলব্যাগ। কয়েকটা বই। পেন্সিল বক্সে রাখা প্রিয় রাবার।
রামিসা আর ফিরবে না। এই সত্য মেনে নেওয়া সহজ না।
আমরা কি সত্যিই বদলাতে চাই, নাকি প্রতিবারের মতো এবারও কিছুদিন ক্ষুব্ধ থেকে পরের শিরোনামের অপেক্ষায় থাকবো?
শিশুদের নিরাপত্তা শুধু আইনের দায়িত্ব না। এটা পরিবার, স্কুল, প্রতিবেশী, রাষ্ট্র—সবাই মিলে তৈরি করা একটা পরিবেশ। সেই পরিবেশ ভেঙে গেলে, কোনো শিশুই একা নিরাপদ থাকতে পারে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।