ভূমিকম্প থামানো যাবে না, কিন্তু ধ্বংস ঠেকানো যায়
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষনধর্মী। ২৩ নভেম্বর, ২০২৫
২০১১ সালের মার্চে জাপানে ৯.১ মাত্রার ভূমিকম্পটা যখন আসে, আমি টিভিতে দেখছিলাম। সুনামি এসে শহর গিলে নিচ্ছে, কিন্তু টোকিও শহরের কিছু অংশে গাড়ি চলছে, হাসপাতালে অপারেশন চলছে, কোথাও কোনো কাচ ভাঙেনি। সেই ছবিগুলো আজও চোখে লেগে আছে।
একই ঝাঁকুনি, দুই রকম ফল।
এক জায়গায় লাশের সারি, আরেক জায়গায় জীবন যেমন চলছিল তেমনি চলছে।
ফারাকটা কোথায়?
টাকায় না, মনের জোরে না।
ফারাকটা বেস আইসোলেশন নামের একটা প্রযুক্তিতে।
বেস আইসোলেশন কি?
বেস আইসোলেশন মানে ভবনকে মাটির সঙ্গে আঠার মতো আটকে না রাখা। ভবনের নিচে রাবারের বড় বড় বেয়ারিং আর ড্যাম্পার বসানো হয়। মাটি যখন পাগলের মতো কাঁপে, ভবনটা তার ওপর ভাসতে থাকে—ধীরে ধীরে দোলে, কিন্তু ভাঙে না। আমি নিজে চোখে দেখেছি ইউটিউবে—একটা সাততলা ভবন কাঁপছে যেন সমুদ্রের ঢেউয়ে নৌকা, কিন্তু ভিতরে চেয়ার-টেবিলও নড়ছে না।
জাপানে এটা এখন বাধ্যতামূলক। স্কুল হোক, হাসপাতাল হোক, পুরনো বিল্ডিং হোক—সবাইকে রেট্রোফিট করতে হচ্ছে। তারা বলে, “ভূমিকম্প আমাদের বন্ধু নয়, কিন্তু শত্রুও না। আমরা শিখে গেছি তার সঙ্গে বাস করতে।”
আমাদের দেশে কী হচ্ছে?
BNBC-2020 কোডে এসেছে বেস আইসোলেশনের কথা। রূপপুর পাওয়ার প্ল্যান্টে লাগানো হয়েছে, মেট্রোরেলের কয়েকটা স্টেশনে লাগানো হয়েছে, কিছু নতুন টাওয়ারে লাগছে। খবর ভালো। কিন্তু আমার প্রশ্ন একটাই—এটা কি শুধু সরকারি মেগা প্রজেক্ট আর ধনীদের টাওয়ারের জন্য থাকবে?
আমি যে বাড়িতে থাকি, সেটা দশতলা। ২০০৭ সালে বানানো। কোনো আইসোলেশন নেই।
পাশের বাড়ির দারোয়ানের ছেলে যে স্কুলে পড়ে, সেখানেও নেই।
গুলশান-বনানীতে যা হচ্ছে, মিরপুর-উত্তরায় তা হচ্ছে না। এটা মেনে নিতে পারি না।
আমি ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কথা বলি। তারা বলে, বেস আইসোলেশন বসাতে খরচ বাড়ে ৮-১২%। দশ কোটি টাকার ভবনে এক-দেড় কোটি বেশি।
এটা কি সত্যিই “লাক্সারি”?
নাকি আমরা এখনো জীবনের দাম হিসেব করতে শিখিনি?
আমার মনে আছে ২০১৫ সালের নেপালের ভূমিকম্প। ঢাকায় তেমন কিছু হয়নি, কিন্তু আমার অফিসের ছয়তলা বিল্ডিংটা এমন কাঁপছিল যে সিঁড়ি দিয়ে নামতে ভয় করছিল। সেদিন বুঝেছিলাম—পরের বার যদি আসে, তবে আমরা প্রস্তুত না।
আমি চাই না আমাদের দেশে আরেকটা রানা প্লাজা হোক, শুধু এবার ভূমিকম্পের কারণে।
আমি চাই না আমার মেয়ে যে স্কুলে পড়ে, সেটা যেন মাটির সঙ্গে আঠার মতো আটকে থাকে।
আমি চাই, আমাদের বিল্ডিং কোড শুধু কাগজে না থাকে—রাস্তায়, স্কুলে, হাসপাতালে, আমাদের বাসার নিচে নামক।
ভূমিকম্প আসবেই। কিন্তু ভবন ভাঙবে কি না, সেটা আমরা ঠিক করব।
আজকে যদি একটু বেশি খরচ করি, কালকে হাজার হাজার মানুষের লাশ গোনার দরকার হবে না।
এটাই আমার বিশ্বাস। এটাই আমার দাবি।
আমরা পারি। শুধু চাইতে হবে।
#ভূমিকম্পথামানোযাবেনা #ধ্বংসঠেকানোযায়
#বেসআইসোলেশনচাই #রানাপ্লাজাদুইহবেনা
#ঢাকাকে বাঁচাও #EarthquakeReadyBD
#SafeBangladesh #BuildForLife
#জাপানশিখিয়েছে #আমারবাড়িটাভাঙবেনা
#BNBC2020 #ভবনভাঙলে সব শেষ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।