ছাই দিয়ে ঘর হয় না
(সম্পর্ক ও মানবিক মনস্তত্ত্ব)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
২৫ অক্টোবর ২০২৬
একটি পোড়া বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আগুন যদি একদিন বলে, ‘আমি দুঃখিত’, বাড়ির মালিক কি সেই কথায় তার হারানো আশ্রয় ফিরে পাবেন? আগুনের অনুতাপ সত্যি হতে পারে। কিন্তু তাতে পুড়ে যাওয়া ঘরটা আর ফিরে আসে না।
মানুষের সম্পর্কেও ঠিক এমনটাই ঘটে। কিছু ঘটনার জন্য ক্ষমা চাওয়া যায়, অনুশোচনা করা যায়, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া সময়টা আর আগের মতো ফিরিয়ে আনা যায় না।
আমাদের চারপাশে এমন একটা পরিবারের গল্প প্রায়ই দেখা যায়। সেখানে একজন মানুষ দিনের পর দিন অবহেলার শিকার। তার কথা গুরুত্ব পায় না, তার কষ্টকে বাড়াবাড়ি বলা হয়, প্রতিবাদ করলে তাকেই দোষী বানানো হয়। শুরুতে সে বোঝানোর চেষ্টা করে। কখনো অভিমান করে, কখনো রাগ দেখায়, কখনো একান্তে বসে নিজের কষ্টের কথা বলে।
কিন্তু প্রতিবার তার কথাগুলো দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে এলে, একসময় সে চুপ হয়ে যায়।
এই চুপ হয়ে যাওয়াকে আমরা মানিয়ে নেওয়া বলে ভুল করি। আসলে মানুষটা তখন আর কোনো প্রত্যাশাই রাখে না। যার কাছে একসময় নিজের দুঃখের কথা বলতে ইচ্ছে করত, তার সামনেই এখন সে স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করে। কথাবার্তা হয়, প্রয়োজন মেটে, পারিবারিক সম্পর্কও টিকে থাকে; শুধু ভেতরের দরজাটা আস্তে করে বন্ধ হয়ে যায়।
বাইরে থেকে দেখলে কিছুই বোঝার উপায় থাকে না।
তারপর একদিন পরিস্থিতি বদলায়। যে মানুষটা এতদিন অন্যের কষ্টকে পাত্তা দেয়নি, সে হঠাৎ বুঝতে পারে কী হারাতে বসেছে। সে ক্ষমা চায়, আগের মতো কথা বলতে চায়।
কিন্তু এতদিন যে মানুষটা একা একা নিজের কষ্ট সামলেছে, সে কি একটা ‘সরি’ শুনলেই আগের জায়গায় ফিরে যেতে পারবে?
হয়তো সে রাগ পুষে রাখতে চায় না। হয়তো পুরোনো হিসাবও আর করতে চায় না। তবু বিশ্বাস করতে গেলেই মনে পড়ে যায়, কতবার সে সাহায্য চেয়েছিল, আর কতবার তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে তার অনুভূতির কোনো মূল্যই নেই।
এই মনে পড়াটা প্রতিশোধ থেকে আসে না, আসে অভিজ্ঞতা থেকে। মানুষ কখনো কখনো অপরাধীকে ক্ষমা করে দেয়, কিন্তু তার কাছে আর নিজেকে নিরাপদ মনে করতে পারে না।
এই পার্থক্যটাই আমরা বুঝতে চাই না। আমাদের কাছে ক্ষমা মানে যেন সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া। বিশেষ করে পরিবারের মধ্যে একটা চাপ তৈরি হয়— এত বছরের সম্পর্ক, ভুলে যাও না। সে যখন ক্ষমা চেয়েছে, আর কত শাস্তি দেবে?
কথাগুলো বলা সহজ। কিন্তু যে মানুষটা কষ্ট পেয়েছে, তার কাছে অতীত কোনো সুইচ না যে চাইলেই বন্ধ করে দেবে। ক্ষমা চাওয়াটা কয়েক মুহূর্তের ঘটনা, সেই আঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে কারো কারো বছরের পর বছর লেগে যায়।
আর সব ক্ষমা চাওয়ার পেছনে একই অনুশোচনা থাকে না। কেউ নিজের ভুল বুঝে সত্যিই বদলে যায়। কেউ বোঝে তার আচরণ অন্যায় ছিল, কিন্তু পরিণতিটা মেনে নিতে পারে না। আর কেউ ক্ষমা চায় শুধু সম্পর্কটা হারানোর ভয়ে, সুযোগ পেলেই আবার আগের আচরণে ফিরে যায়।
পার্থক্যটা বোঝা যায় ‘দুঃখিত’ বলার মধ্যে না, পরের দিনগুলোর আচরণে। যে সত্যিই অনুতপ্ত, সে দায়টা অন্যের ঘাড়ে চাপায় না। সে বলে না, ‘তুমি আমাকে বাধ্য করেছিলে।’ সে ধরেও নেয় না যে ক্ষমা চেয়েছে বলেই আগের অধিকার ফিরে পেয়েছে।
এখানে আহত মানুষটারও একটা অধিকার আছে— নিজের শান্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অধিকার। কাউকে ক্ষমা করেও তার কাছ থেকে দূরে থাকা যায়। পুরোনো রাগ ছেড়ে দিয়েও আগের ঘনিষ্ঠতায় ফিরে না যাওয়া যায়। এর মানে এই না যে মানুষটা নিষ্ঠুর হয়ে গেছে। এর মানে সে শুধু বুঝেছে, একই জায়গায় বারবার আহত হওয়ার ঝুঁকিটা সে আর নিতে চায় না।
ক্ষমা কখনো মুক্তি দেয়, কখনো সম্পর্ক মেরামতের সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু ক্ষমার নামে কাউকে নিজের জীবনে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য করা হলে, সেটা আর ক্ষমা থাকে না, সেটা হয়ে ওঠে নতুন এক চাপ।
জীবনের কিছু সম্পর্ক বড় কোনো ঝগড়ায় শেষ হয় না। শেষ হয় ছোট ছোট অবহেলা আর অসমাপ্ত কথার ভারে। মানুষটা চলে যাওয়ার অনেক আগেই সম্পর্কের ভেতর থেকে সরে যায়।
তাই ক্ষমা চাওয়ার মূল্য আছে, অনুতাপেরও মূল্য আছে। কিন্তু অনুশোচনা করলেই তার সমস্ত পরিণতি মুছে যায় না।
আগুন একদিন অনুতপ্ত হতে পারে, বাড়ির মালিক তাকে ক্ষমাও করে দিতে পারেন। তবু তিনি কোথায় আবার ঘর তুলবেন, কাকে সেই ঘরের চাবি দেবেন— সেই সিদ্ধান্তটা একান্তই তার নিজের।
কারণ আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। কিন্তু আমার ঘরের চাবিটা আর তার হাতে তুলে দিইনি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।