দানবক্স কোথায়?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ৩০ আগস্ট ২০২৬
হাসপাতালের করিডোরে রাত নামলে মানুষকে অন্য রকম দেখায়।
দিনের ভিড় কমে আসে। আত্মীয়স্বজনের ছোটাছুটি থামে। নার্সরা নীরবে এক ওয়ার্ড থেকে আরেক ওয়ার্ডে যান। কোথাও অক্সিজেনের শব্দ, কোথাও মনিটরের বিপ্ বিপ্। করিডোরের কোনো এক চেয়ারে বসে থাকা মানুষটি বারবার মোবাইলের পর্দায় তাকান। ঘড়ি দেখেন। তারপর ক্যালকুলেটর খোলেন।
হাতে কত টাকা আছে?
কাল কত লাগবে?
আর কার কাছে চাওয়া যায়?
ভেতরে তার আপনজন শুয়ে আছেন। চিকিৎসা চলছে। ডাক্তার বলেছেন, চিকিৎসা বন্ধ করা যাবে না। কিন্তু চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে টাকার প্রয়োজন, সেটাই হয়তো পরিবারের হাতে নেই।
এই দৃশ্য বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে অচেনা নয়।
অসুস্থতা এখানে শুধু শরীরের ওপর চাপ তৈরি করে না; অনেক পরিবারের সঞ্চয়, আয়, এমনকি ভবিষ্যৎও নড়বড়ে করে দেয়। কেউ ধার করেন, কেউ গয়না বিক্রি করেন, কেউ জমি বন্ধক রাখেন। আর সব পথ যখন প্রায় শেষ হয়ে আসে, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেখা যায়—
“চিকিৎসার জন্য সাহায্য প্রয়োজন।”
এই জায়গা থেকেই দানের বিষয়টি নতুন করে ভাবতে ইচ্ছে করে।
আমাদের সমাজে দানের অভাব নেই। মানুষ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মাজার, এতিমখানা, দরিদ্র মানুষ কিংবা নানা সামাজিক কাজে অর্থ দেন। বিশ্বাস, অভ্যাস, মানবিকতা—সব মিলিয়েই এই সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
কিন্তু আমরা কত দিচ্ছি, তার হিসাব যতটা করি, কোথায় দিচ্ছি এবং কখন দিচ্ছি—সেই হিসাবটা কি ততটা করি?
ধরুন, একজন মানুষ আজ হাসপাতালে শুয়ে আছেন। তার চিকিৎসার জন্য পাঁচ হাজার টাকা দরকার। টাকা না পেলে একটি জরুরি ওষুধ কেনা যাবে না, কিংবা চিকিৎসার পরের ধাপ শুরু হবে না।
অন্যদিকে কোনো মৃত মানুষের স্মরণে আগামী সপ্তাহেও কিছু করা সম্ভব।
এই পার্থক্যটাই গুরুত্বপূর্ণ।
মৃত মানুষের জন্য আগামীকালও কিছু করা যায়। জীবিত মানুষের চিকিৎসার টাকা অনেক সময় আজই দরকার।
জীবনের কিছু প্রয়োজন অপেক্ষা করতে পারে না।
আজকের ওষুধ কাল কিনলে একই কাজ নাও করতে পারে। আজকের অপারেশন পিছিয়ে গেলে শরীরের অবস্থা বদলে যেতে পারে। আজ যে মানুষটি চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন, কাল হয়তো সেই সুযোগটাই আর থাকবে না।
তাই দানের ক্ষেত্রেও সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
একজন অসুস্থ মানুষের চিকিৎসায় দেওয়া টাকা শুধু একটি বিল মেটায় না। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা।
একজন বাবা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলে শুধু একজন রোগী হাসপাতাল থেকে বের হন না। তার সন্তান বাবাকে ফিরে পায়। তার স্ত্রী সংসারের একজন মানুষকে ফিরে পান। পরিবারের আয় আবার শুরু হতে পারে।
অর্থাৎ একজন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার প্রভাব তার নিজের শরীরের মধ্যেই আটকে থাকে না।
সেটা ছড়িয়ে পড়ে তার পুরো পরিবারে।
তাহলে কি মাজারে দান করা বন্ধ করতে হবে?
না। প্রশ্নটা মাজার নিয়ে নয়। প্রশ্নটা দানের অগ্রাধিকার নিয়ে।
মানুষ তার বিশ্বাসের জায়গায় দান করবেন—এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই দানের পাশাপাশি যদি জীবিত মানুষের প্রয়োজনের জন্যও কিছু রাখা যায়, তাহলে দানের অর্থ আরও বিস্তৃত হয়।
আপনার পরিচিত কেউ অসুস্থ হলে খোঁজ নেওয়া যায়। কোনো দরিদ্র পরিবারের চিকিৎসা আটকে গেলে সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ানো যায়। অপরিচিত কারও সাহায্যের আবেদন সত্যি হলে তার চিকিৎসার খরচের একটি অংশ সরাসরি দেওয়া যায়।
এখানে টাকার অঙ্কটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
গুরুত্বপূর্ণ হলো, আপনার সামান্য অর্থটি এমন সময়ে পৌঁছাল কি না, যখন সেটি সত্যিই দরকার ছিল।
অবশ্য সাহায্য করার ক্ষেত্রেও সতর্কতা দরকার। সব আবেদন সত্যি নয়। মানুষের অসহায়ত্বকে ব্যবহার করে প্রতারণাও হয়। তাই আবেগের সঙ্গে যাচাইও থাকা উচিত। চিকিৎসার প্রয়োজন এবং খরচ যতটা সম্ভব নিশ্চিত করে তারপর সাহায্য করাই ভালো।
আমাদের দানের সংস্কৃতিতে হয়তো এই জায়গাটাই নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
আমরা সাধারণত দানকে একটি কাজ হিসেবে দেখি—টাকা দিলাম, দায়িত্ব শেষ।
কিন্তু দান যদি মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে বিষয়টি একটু অন্য রকম হয়ে যায়।
কে কত দিলেন, সেটা তখন মুখ্য থাকে না।
বরং প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—কখন দিলেন, কাকে দিলেন, আর সেই টাকাটা তখন তার কতটা প্রয়োজন ছিল।
হয়তো এই কারণেই আমাদের প্রত্যেকের একটা অদৃশ্য দানবক্স থাকা দরকার।
কোনো মাজারের সামনে নয়।
কোনো প্রতিষ্ঠানের দরজায় নয়।
নিজের ঘরে।
প্রতি মাসে সামান্য কিছু টাকা সেখানে রাখা যেতে পারে—কোনো অসুস্থ মানুষের জন্য, কোনো শিশুর চিকিৎসার জন্য, কোনো বৃদ্ধের ওষুধের জন্য। কাউকে জানানোও দরকার নেই। নাম প্রকাশের প্রয়োজন নেই।
প্রয়োজনের সময় সেই টাকা বেরিয়ে যাবে।
কেউ হয়তো জানবেও না, কার দেওয়া টাকা তার চিকিৎসার একটি অংশ হয়ে গেল।
কিন্তু একজন মানুষ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবেন।
সেটাই যথেষ্ট।
আমরা মৃত মানুষকে স্মরণ করব। তাদের জন্য দোয়া করব। তাদের স্মৃতি ধরে রাখব। মানুষের বিশ্বাসের জায়গাগুলোও থাকবে।
তার পাশাপাশি জীবিত মানুষটির কথাও মনে রাখব—যিনি এখনও আমাদের সামনে আছেন, এখনও চিকিৎসা নিচ্ছেন, এখনও বাঁচতে চাইছেন।
কারণ মৃত্যুর পরে একজন মানুষের জন্য অনেক কিছু করার সময় পাওয়া যায়।
কিন্তু জীবিত একজন মানুষের ক্ষেত্রে সময়টাই সবচেয়ে বড় বিষয়।
হয়তো আজ রাতে কোনো হাসপাতালের করিডোরে আবার একজন স্ত্রী ক্যালকুলেটর খুলে বসেছেন।
হাতে থাকা টাকাটা আর হাসপাতালের বিলের অঙ্কটা মিলছে না।
তিনি হয়তো কারও কাছে ফোন করবেন।
হয়তো কাউকে বলবেন,
“আর একটু সাহায্য করতে পারবেন?”
আর আমরা হয়তো তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাব।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।