স্বাধীনতারও সীমা আছে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী সামাজিক প্রবন্ধ
১৩ জুলাই, ২০২৬
স্বাধীনতা সুন্দর। কিন্তু দায়িত্ব ছাড়া স্বাধীনতা কখনোই সুন্দর হতে পারে না।
এই কথাটা আমরা সবাই শুনেছি, কিন্তু মানি কজন?
আজকাল "আমার জীবন, আমার সিদ্ধান্ত" - এই বাক্যটা খুব জনপ্রিয়। নিঃসন্দেহে প্রতিটি মানুষের নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার আছে। নিজের মত প্রকাশের অধিকার আছে। নিজের পছন্দ-অপছন্দেরও মূল্য আছে। কিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। আমি যা চাই, তা করতে গিয়ে যদি অন্য কারও ক্ষতি হয়, তাহলে সেটাকে কি আর স্বাধীনতা বলা যায়?
আমার মনে হয়, আমরা ঠিক এই জায়গাতেই ভুল করি।
স্বাধীনতা মানে নিয়ম ভাঙার লাইসেন্স নয়। স্বাধীনতা মানে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার অধিকার, এবং সেই সিদ্ধান্তের ভালো-মন্দ সমস্ত ফলের দায় নিজের কাঁধে নেওয়ার সাহস।
এখন ব্যক্তিস্বাধীনতাকে অনেকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেন, যেন তাকে কোনো প্রশ্নই করা যাবে না। বাবা-মা কিছু বললেই সেটা হস্তক্ষেপ। শিক্ষক পরামর্শ দিলেই সেটা নিয়ন্ত্রণ। সমাজ কোনো আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুললেই সেটা স্বাধীনতার ওপর আঘাত।
কিন্তু বাস্তব জীবন কি এতটা সরল?
আমরা কেউই বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বাস করি না। আমরা পরিবারে বাস করি, সমাজে বাস করি। আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত কোনো না কোনোভাবে অন্যের জীবনকে স্পর্শ করে। তাই স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গেই দায়িত্ব চলে আসে। এই দুটোকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
একজন বাবা যদি বলেন, "আমি স্বাধীন, পরিবারকে সময় দেব কি দেব না সেটা আমার ব্যাপার", তাহলে সেই স্বাধীনতার মূল্য দিতে হয় তার সন্তানকে।
একজন সন্তান যদি বলে, "আমার জীবন, বাবা-মায়ের অনুভূতির কোনো মূল্য নেই", তাহলে সেই স্বাধীনতার কষ্ট বয়ে বেড়ান বৃদ্ধ বাবা-মা।
একজন নাগরিক যদি বলে, "রাস্তার নিয়ম মানব কি মানব না, সেটা আমার বিষয়", তাহলে সেই স্বাধীনতার জন্য বিপদে পড়ে একজন সম্পূর্ণ নিরপরাধ মানুষ।
অর্থাৎ, আমার স্বাধীনতা ঠিক সেখানেই শেষ হয়, যেখানে অন্যের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে।
ভার্চুয়াল জগতে দায়িত্বহীন স্বাধীনতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট। অনেকেই মনে করেন, যা ইচ্ছে তাই বলতে পারাই স্বাধীনতা। কিন্তু একটি মিথ্যা তথ্য, একটি অপমানজনক মন্তব্য বা একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন পোস্ট যে কত মানুষের ক্ষতি করতে পারে, তা আমরা ভেবেও দেখি না।
সমাধানটা কঠিন নয়। মত প্রকাশের আগে তিনটি প্রশ্ন নিজেকে করা যেতে পারে। আমি যা বলছি, তা কি সত্য? তা কি প্রয়োজনীয়? এবং তা কি অন্যের সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখে বলা হচ্ছে? এই তিনটি ছাঁকনিতে ফেললেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে।
পরিবার ও সমাজে ভারসাম্য
পরিবারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। স্বাধীনতার অর্থ এই নয় যে, সম্পর্কের কোনো দায় নেই। সংসারে সবাই যদি কেবল নিজের ইচ্ছাকেই বড় করে দেখে, সেখানে ভালোবাসা থাকে না, সংঘাত বাড়ে। কারণ সম্পর্ক টিকে থাকে সমঝোতা, সম্মান আর দায়িত্ববোধের ওপর।
এর সমাধান হলো সংলাপ। পরিবারে স্বাধীনতা চাইলে, আগে অন্যের স্বাধীনতাকে সম্মান করতে শিখতে হবে। "আমি এটা করতে চাই" বলার পাশাপাশি "তোমাদের এতে কোনো অসুবিধা হবে কি না" - এইটুকু জিজ্ঞেস করার অভ্যাসই অনেক দূরত্ব কমিয়ে দেয়।
সমাজের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। যেখানে সবাই কেবল নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলে, কিন্তু নিজের দায়িত্ব নিয়ে নীরব থাকে, সেখানে ধীরে ধীরে বিশ্বাস কমে যায়। মানুষ সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলে। সহনশীলতা কমে যায়। শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার নামে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে কেউ আর কারও প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে চায় না।
এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় হলো অধিকারের পাশাপাশি কর্তব্যের চর্চা করা। রাস্তায় নিয়ম মানা, অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করা, ভিন্নমতের সঙ্গে ভদ্রভাবে দ্বিমত পোষণ করা - এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই সমাজে স্বাধীনতার সুস্থ পরিবেশ তৈরি করে।
আমার মনে হয়, সত্যিকারের স্বাধীন মানুষ সেই, যে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে, আবার সেই সিদ্ধান্তের ভালো-মন্দ ফলও গ্রহণ করতে পারে। যে নিজের অধিকার জানে, কিন্তু অন্যের অধিকারকেও সমান গুরুত্ব দেয়। যে স্বাধীনতাকে ভোগের বিষয় নয়, দায়িত্বের বিষয় হিসেবেও দেখে।
স্বাধীনতা আর দায়িত্ব একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়। বরং একটি ছাড়া অন্যটি অসম্পূর্ণ। দায়িত্বহীন স্বাধীনতা বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, আর স্বাধীনতাহীন দায়িত্ব মানুষকে বন্দি করে রাখে। সুস্থ সমাজের জন্য দুটোরই ভারসাম্য প্রয়োজন।
হয়তো এখন সময় এসেছে স্বাধীনতার অর্থ নতুন করে ভাবার। শুধু "আমি কী চাই" - এই প্রশ্নের বাইরে গিয়ে যদি আমরা আরেকটি প্রশ্ন করি, "আমার এই সিদ্ধান্তে অন্যের ওপর কী প্রভাব পড়বে?" - তাহলেই অনেক সমস্যার সমাধান নিজে থেকেই শুরু হবে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।