ঈদ আর বৈষম্য
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ২৮ মে, ২০২৬
ঈদের আগে শহরটা বদলে যায়।
শপিং মলের সামনে আলো বাড়ে। রাস্তায় ভিড় বাড়ে। ফেসবুকে নতুন কাপড়ের ছবি বাড়ে।
একই সঙ্গে কিছু মানুষের হিসাবও বাড়ে।
মিরপুরের এক গার্মেন্টস কর্মী মেয়েকে গত বছর বলতে শুনেছিলাম, “এইবার ছোট ভাইটার জন্য কিনছি। আমার পুরানোটাই চলবে।”
কথাটা সে খুব স্বাভাবিকভাবেই বলেছিল। যেন এটাই নিয়ম।
ঈদ বোধহয় এমন একটা সময়, যখন সমাজের পার্থক্যগুলো একটু বেশি চোখে পড়ে। বছরের অন্য সময় যে মানুষটা চুপচাপ নিজের জীবন চালিয়ে নেয়, ঈদের সময় তার অভাবটাও যেন একটু বেশি দৃশ্যমান হয়ে যায়।
একটা বাচ্চা দোকানে দাঁড়িয়ে তিন জোড়া জুতার মধ্যে কোনটা নেবে বুঝতে পারে না।
আরেকটা বাচ্চা জুতার বাক্সে হাত দিয়েই দাম জিজ্ঞেস করে।
দুই দৃশ্যই সত্যি। দুই ঈদও সত্যি।
আমরা সাধারণত বৈষম্য বলতে শুধু টাকার পার্থক্য বুঝি। কিন্তু ঈদের সময় আরেক ধরনের পার্থক্যও দেখা যায়।
কারও কাছে ঈদ মানে ছুটি। কারও কাছে ঈদ মানে বাড়ি যাওয়ার টিকিটের চিন্তা। কারও কাছে ঈদ মানে পরিবারের সঙ্গে সময়। আবার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ডিউটি করা ডাক্তারটার কাছেও ঈদ আসে। শুধু একটু অন্যভাবে।
সমস্যা আনন্দে না। সমস্যা হয় তুলনায়।
কারণ ঈদের সময় আমরা অজান্তেই একে অপরের জীবনের দিকে তাকাতে শুরু করি।
কে কোথায় ঘুরতে গেল। কার বাসায় কত আয়োজন।
কার সন্তানের জামা কত সুন্দর।
এই তাকানোটা সবসময় খারাপ না। কিন্তু কখনও কখনও এটা মানুষের ভেতরে অদ্ভুত এক চাপ তৈরি করে।
সবাই সেটা প্রকাশও করে না।
ঈদের আগের রাতে অনেক মধ্যবিত্ত বাসায় আলো একটু বেশি রাত পর্যন্ত জ্বলে।
বাবা ক্যালকুলেটর টেপেন।
মা কাপড়ের দাম আর বাজার খরচের তালিকা মিলিয়ে দেখেন।
একটা জুতা নিলে হয়তো পর্দাটা বদলানো হবে না।
কোরবানির গরু একটু ছোট হলে হয়তো কোচিং ফিটা সময়মতো দেওয়া যাবে।
বাইরে থেকে এসব বোঝা যায় না।
ছবিতে তো আরও না।
ফেসবুকের টাইমলাইনে ঈদ খুব সুন্দর দেখায়।
বাস্তবেও সুন্দর। কিন্তু পুরো ছবিটা সেখানে থাকে না।
কারণ কেউ স্ট্যাটাস দেয় না, “এই মাসে বেতন দেরি হওয়ায় ঈদের বাজার অর্ধেক কমিয়ে ফেললাম।”
ঈদের সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার সম্ভবত এটুকুই।
এটা একই দিনে মানুষকে আনন্দও মনে করিয়ে দেয়, আবার সীমাবদ্ধতাও মনে করিয়ে দেয়।
তবু এই শহরেই ছোট ছোট কিছু দৃশ্য দেখা যায়।
মোড়ের চায়ের দোকানদার রহিম চাচা প্রতি ঈদে পাশের এতিমখানায় সেমাই পাঠান। খুব বেশি না। কিন্তু নিয়ম করে পাঠান।
পুরান ঢাকার এক দর্জি শেষ রাত পর্যন্ত কাজ করেন, শুধু একটা বাচ্চার জামাটা ঈদের আগেই তুলে দিতে পারবেন বলে।
এই দৃশ্যগুলো খুব বড় খবর না।
তবু শহরটা পুরোপুরি নির্দয় হয়ে যায়নি, সম্ভবত তার প্রমাণ এগুলোই।
ঈদের দিন সকালে আমরা সবাই নতুন কাপড় পরি।
শুধু সবার ভেতরের গল্পটা নতুন হয় না।
কেউ আনন্দ লুকায়।
কেউ কষ্ট লুকায়।
আর শহরটা, প্রতি বছরের মতো, দুটোই একসঙ্গে দেখে যায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।