অভিমানী সমাজ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী সামাজিক প্রবন্ধ
১৩ জুলাই, ২০২৬
আজ সবাই নিজের কষ্টের কথা বলতে চায়, কিন্তু অন্যের কষ্ট শুনতে চায় না।
কথাটা শুনতে কঠিন লাগলেও, চারপাশে তাকালেই এর সত্যতা টের পাওয়া যায়।
আগে মানুষ গল্প করত। এখন মানুষ বক্তব্য দেয়। আগে একজন বললে আরেকজন মন দিয়ে শুনত। এখন একজন কথা শেষ করার আগেই অন্যজন নিজের গল্প শুরু করে দেয়। যেন শোনার জন্য নয়, বলার জন্যই সবাই মুখিয়ে আছে।
আমরা ক্রমেই এমন এক সমাজে পরিণত হচ্ছি, যেখানে প্রত্যেকের নিজস্ব অভিমান আছে, নিজস্ব কষ্ট আছে, নিজস্ব না-পাওয়ার হিসাব আছে। কিন্তু অন্য মানুষের ভেতরেও যে একই যুদ্ধ চলছে, সেটা বোঝার ধৈর্য আমাদের ফুরিয়ে আসছে।
সম্ভবত এ কারণেই, এত মানুষের ভিড়েও অনেকে ভীষণ একা।
আমরা প্রায়ই বলি, “কেউ আমাকে বোঝে না।” অথচ খুব কম মানুষই নিজেকে প্রশ্ন করি, “আমি শেষ কবে কাউকে মন দিয়ে শুনেছি?”
আসলে শোনাটাও একটা শিল্প। শুধু শব্দ শোনা নয়, মানুষের ভেতরের অস্থিরতাটুকুও টের পাওয়ার চেষ্টা। সেই চর্চাটা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই বদলটাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সেখানে সবাই নিজের কথা বলছে— নিজের সাফল্য, নিজের কষ্ট, নিজের মতামত। এতে দোষ নেই। সমস্যা তখনই হয়, যখন অন্যের কথার জন্য আর জায়গা থাকে না।
আজকাল কেউ নিজের কষ্টের কথা বললেই আমরা শুনতে চাই না। বরং সঙ্গে সঙ্গে রায় দিয়ে বসি। বলি, “এটা তেমন কিছু না”, “তোমারই ভুল ছিল”, “এত ভাবছ কেন?”
এই কয়েকটা কথাই একজন মানুষকে আরও নিঃসঙ্গ করে তোলে।
মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে বিষয়টার গভীর সম্পর্ক আছে। একজন মানুষ সবসময় সমাধান চায় না। অনেক সময় সে শুধু চায়, কেউ তাকে না থামিয়ে একটু শুনুক। কোনো উপদেশ নয়, কোনো বিচার নয়— শুধু একটু মনোযোগ।
কিন্তু আমরা কী করি?
কেউ কথা শেষ করার আগেই পরামর্শ দিতে শুরু করি। নিজের অভিজ্ঞতার ঝাঁপি খুলে বসি। কিংবা এমনভাবে বিচার করি, যেন পুরো ঘটনাটা নিজের চোখেই দেখেছি।
এভাবে ধীরে ধীরে মানুষ নিজের কষ্ট নিজের ভেতরেই গুটিয়ে রাখতে শেখে। বাইরে হাসে, ভেতরে ভেঙে পড়ে। কারণ সে জানে, তার কথা শোনার লোকের চেয়ে তাকে বিচার করার লোকই বেশি।
সমাজ তখনই রূঢ় হয়ে ওঠে, যখন সহানুভূতির পরিসর ছোট হতে থাকে।
সহানুভূতি মানে সব কথায় সায় দেওয়া নয়। সহানুভূতি মানে অন্য মানুষের অনুভূতির অস্তিত্বকে সম্মান করা। তার কষ্টকে ছোট না করা। তার অভিজ্ঞতাকে তুচ্ছ না ভাবা।
এই অভ্যাসটা পরিবার থেকেই ফিরিয়ে আনা দরকার। প্রতিদিন অন্তত কিছুটা সময় এমন থাকুক, যেখানে সবাই নিজের কথা বলতে পারবে, আর অন্যরা বাধা না দিয়ে শুনবে।
বন্ধুত্বেও এমন মানুষ দরকার, যার কাছে নিজের দুর্বলতার কথাও নির্দ্বিধায় বলা যায়। সংসারেও দরকার এমন পরিবেশ, যেখানে বিচারের চেয়ে বোঝার চেষ্টা বেশি হবে।
আমার বিশ্বাস, সমাজ বদলানোর শুরুটা বড় কোনো প্রকল্প দিয়ে হয় না। শুরু হয় ছোট ছোট অভ্যাস দিয়ে। কাউকে মাঝপথে না থামানো, তার কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা, তাড়াহুড়ো করে রায় না দেওয়া— এই ছোট কাজগুলোই একদিন বড় পরিবর্তন আনবে।
আমরা সবাই চাই, কেউ আমাদের বুঝুক। কিন্তু সেই সমাজ তৈরি হবে তখনই, যখন আমরা নিজেরাও অন্যকে বোঝার চেষ্টা করব।
হয়তো আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট টাকার নয়, প্রযুক্তিরও নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো— আমরা বলতে শিখেছি, কিন্তু শুনতে ভুলে যাচ্ছি।
আপনার মতে, মানুষ এখন কম শোনে, নাকি বেশি বিচার করে? মন্তব্যে আপনার মতামত জানান।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।