প্রার্থনার আড়ালে
(ধর্ম, আত্মসমালোচনা ও মানুষের মনস্তত্ত্ব)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা |
২৩ অক্টোবর ২০২৬
মানুষ যখন প্রার্থনায় হাত তোলে, তখন তার চাওয়ার তালিকাটা খুব দীর্ঘ না হলেও সেখানে নিজের প্রয়োজনের জায়গা বেশ বড়। কেউ সন্তানের সুস্থতা চান, কেউ চাকরি পাওয়ার জন্য কাঁদেন, কেউ ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি চান, কেউ আবার প্রিয় মানুষটিকে হারানোর ভয়ে স্রষ্টার কাছে বারবার একই কথা বলেন। এসব চাওয়ার মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই। বিপদে পড়লে মানুষ আশ্রয় খোঁজে, অনিশ্চয়তার মধ্যে ভরসা চায়। প্রার্থনা সেই ভরসারই একটি পথ।
তবু একটা প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা যখন প্রার্থনা করি, তখন কি শুধু নিজের চাওয়াগুলোই স্রষ্টার সামনে তুলে ধরি? নাকি কখনো নিজের কাজ, আচরণ আর ভুলগুলোর দিকেও তাকাই?
একজন বাবা প্রতিদিন ছেলের ভালো ফলের জন্য প্রার্থনা করেন। ছেলে যেন ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পায়, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়, পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করে—এসবই তাঁর চাওয়া। কিন্তু সেই বাবা হয়তো ছেলের সঙ্গে কথা বলার সময় তার ভয়গুলো শোনেন না, অন্যের সন্তানের সঙ্গে তুলনা করেন, সামান্য ব্যর্থতায় অপমান করেন। প্রার্থনায় তিনি সন্তানের মঙ্গল চান, অথচ দৈনন্দিন আচরণে সেই সন্তানের মনে কষ্ট জমিয়ে রাখেন। প্রশ্নটা তাঁর প্রার্থনার আন্তরিকতা নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো, সন্তানের ভালো থাকার যে আকাঙ্ক্ষা তিনি প্রকাশ করেন, তা তাঁর আচরণে কতটা জায়গা পায়।
আমাদের জীবনে এমন অসংগতি অচেনা নয়। মুখে আমরা শান্তি চাই, অথচ ঘরের মানুষের সঙ্গে সামান্য মতবিরোধ হলেই কটু কথা বলি। নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকি, অথচ অন্যের সন্তানের প্রতি অবিচার হলে নীরব থাকি। স্রষ্টার কাছে ন্যায়বিচার চাই, কিন্তু নিজের স্বার্থে অন্যায় সুবিধা নিতে আপত্তি করি না।
একজন মুদি দোকানদারের কথাই ধরা যাক। প্রতিদিন দোকান খোলার আগে তিনি বরকতের জন্য দোয়া করেন। একদিন এক ক্রেতা তাড়াহুড়ো করে বাজার নিয়ে চলে যাওয়ার পর খেয়াল করলেন, ওজনের হিসাবে কিছুটা কম দিয়েছেন তিনি। ভুলটা বুঝেও ডাকলেন না ক্রেতাকে। টাকাটা খুব বেশি নয়, কিন্তু সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার আগে আবারও সেদিনের রোজগারে বরকত চাইলেন। তাঁর প্রার্থনাটি মিথ্যা ছিল কি না, তা বাইরে থেকে বলা কঠিন। তবে দিনের একটি ছোট সিদ্ধান্ত তাঁর প্রার্থনার সঙ্গে যে প্রশ্নটি জুড়ে দিয়েছে, সেটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
প্রার্থনার সঙ্গে জীবনের এই দূরত্বটাই ভাবনার বিষয়।
শুধু প্রার্থনার সংখ্যা দিয়ে কারও চরিত্রের গভীরতা বোঝা যায় না। কেউ নিয়মিত উপাসনা করতে পারেন, আবার তাঁর আচরণে থাকতে পারে অহংকার, অসহিষ্ণুতা কিংবা অন্যের প্রতি অবজ্ঞা। অন্যদিকে, কেউ হয়তো নিজের বিশ্বাস প্রকাশ করেন খুব কম, কিন্তু বিপদে পড়া প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ান, কর্মচারীর পাওনা সময়মতো দেন, দুর্বল মানুষের অসহায়ত্বকে নিজের সুবিধার জন্য ব্যবহার করেন না।
এখানে বিশ্বাস আর আচরণকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলার প্রয়োজন নেই। বরং প্রশ্ন করা দরকার, বিশ্বাস মানুষের আচরণকে কতটা প্রভাবিত করছে। ধর্মীয় অনুশীলন যদি মানুষকে নিজের ভুল দেখতে, অন্যের অধিকার বুঝতে এবং অন্যায় থেকে সরে আসতে সাহায্য করে, তাহলে তার অর্থ গভীর হয়। কিন্তু তা যদি কেবল নিজের চাওয়া পূরণের আশায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে আত্মসমালোচনার দরজাটি বন্ধই থেকে যায়।
প্রার্থনাকে স্রষ্টার সঙ্গে লেনদেন হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয় তখন, যখন মানুষ মনে করতে শুরু করে—আমি এত দিন প্রার্থনা করেছি, এত দান করেছি, এত নিয়ম মেনেছি, তাহলে আমার চাওয়াটি পূরণ হলো না কেন? অসুস্থতা কেন এল, ব্যবসায় ক্ষতি কেন হলো, এত চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত চাকরিটি কেন পেলাম না?
এমন প্রশ্ন হতাশা থেকে আসতে পারে। দীর্ঘদিন কষ্টের মধ্যে থাকা মানুষ কখনো কখনো নিজের বিশ্বাসের কাছেও উত্তর খোঁজেন। সেই প্রশ্নকে অবজ্ঞা করা উচিত নয়। কিন্তু জীবনের প্রতিটি ফলাফলের বিনিময়ে নির্দিষ্ট প্রতিদান পাওয়ার প্রত্যাশা প্রার্থনাকে সংকীর্ণ করে ফেলে। জীবনের সব ফলাফল মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই। সৎ মানুষও অসুস্থ হন, পরিশ্রমী মানুষও ব্যর্থ হন, অন্যায়ের শিকার মানুষও দীর্ঘদিন ন্যায়বিচার পান না। কোনো চাওয়া পূরণ না হওয়াকে তাই নিজের বিশ্বাসের ব্যর্থতা কিংবা স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্কের হিসাব হিসেবে দেখলে মানুষের কষ্ট আরও বাড়তে পারে।
প্রার্থনা মানেই নিজের চাওয়া বাদ দিতে হবে, তা নয়। মানুষের দুর্বলতা আছে, অভাব আছে, ভয় আছে। নিজের জন্য সাহায্য চাওয়া স্বাভাবিক। কেউ অসুস্থ হলে সুস্থতা চাইবেন, বিপদে পড়লে মুক্তি চাইবেন, প্রিয়জনের জন্য কল্যাণ কামনা করবেন—এটাই মানুষের স্বাভাবিক আকুতি। সমস্যা চাওয়ার মধ্যে নয়; সমস্যা তখন, যখন নিজের চাওয়াটাই সব হয়ে ওঠে এবং অন্যের কষ্ট আমাদের কাছে গুরুত্ব হারায়।
একবার ভাবা যেতে পারে, আমরা যাদের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা করি, তাদের জন্য শেষ কবে মন থেকে কিছু চেয়েছি? যে সহকর্মীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করি, তার ভালো হোক—এমন কামনা কি কখনো করেছি? যে আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে, তার জন্য অন্তত বিপদমুক্ত জীবনের প্রার্থনা করতে পেরেছি? যাকে পছন্দ করি না, তার প্রতিও ন্যায়বিচার কামনা করা কি আমাদের পক্ষে সম্ভব?
এসব প্রশ্নের উত্তর সব সময় সহজ হবে না। কারও প্রতি ক্ষোভ থাকলে তার মঙ্গল কামনা করা কঠিন। দীর্ঘদিনের অন্যায়ের শিকার হলে ক্ষমা বা উদারতার কথা শুনতেও বিরক্তি আসতে পারে। তাই অন্যের জন্য প্রার্থনা করার অর্থ নিজের ওপর হওয়া অন্যায় মেনে নেওয়া নয়। অন্যায়ের বিচার চাওয়া, নিজের অধিকার রক্ষা করা এবং একই সঙ্গে প্রতিহিংসার বাইরে থাকার চেষ্টা—এই অবস্থানগুলো একসঙ্গে সম্ভব।
আত্মসমালোচনার আরেকটি দিকও আছে। আমরা প্রার্থনায় অনেক সময় পরিবর্তন চাই, কিন্তু সেই পরিবর্তনের জন্য নিজের অভ্যাস বদলাতে চাই না। ঋণমুক্তি চাই, অথচ সামর্থ্যের বাইরে খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত নিই না। পরিবারের মধ্যে শান্তি চাই, কিন্তু নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করি না। জীবনে নতুন সুযোগ চাই, অথচ শেখার জন্য সময় দিতে অনীহা দেখাই। সব সমস্যার সমাধান যে ব্যক্তিগত চেষ্টায় সম্ভব, তা নয়; তবু যেখানে আমাদের কিছু করার আছে, সেখানে দায়িত্ব এড়িয়ে শুধু ফলের অপেক্ষা করা কতটা যুক্তিসংগত?
প্রার্থনা মানুষের শক্তি হতে পারে, যদি তা তাকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে সাহস দেয়। কঠিন সময়ে ভেঙে না পড়তে সাহায্য করে, নিজের সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে শেখায়, অন্যের প্রতি দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু প্রার্থনার আড়ালে যদি নিজের ভুলগুলো ঢেকে রাখি, তাহলে সেটি আত্মশুদ্ধির বদলে আত্মতুষ্টির আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে।
দিনের শেষে প্রশ্নটি খুব সাধারণ। আজ আমি স্রষ্টার কাছে কী চেয়েছি, তার পাশাপাশি নিজের কাছে কী জানতে চেয়েছি? কারও অধিকার নষ্ট করেছি কি না, কাউকে অকারণে কষ্ট দিয়েছি কি না, নিজের সুবিধার জন্য সত্য আড়াল করেছি কি না—এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সাহস কি আমার আছে?
প্রার্থনায় হাত তোলার মুহূর্তে মানুষ নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করে। সেই স্বীকারোক্তি যদি তাকে নিজের ভুলের সামনেও দাঁড়াতে শেখায়, তাহলে প্রার্থনা কেবল চাওয়ার ভাষা থাকে না। তা হয়ে ওঠে নিজেকে বদলানোর একটি উপলক্ষ।
হয়তো প্রার্থনার শেষে নিজের চাওয়াগুলো পূরণের পাশাপাশি এটুকুও চাওয়া যায়—যা পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করছি, সেই পথে যেন অন্য কারও অধিকার নষ্ট না করি। আর স্রষ্টার কাছে সাহায্য চাইতে গিয়ে নিজের যে ভুলগুলো শুধরে নেওয়া দরকার, সেগুলো যেন দেখতে ভুলে না যাই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।