যে নম্বর মুছতে পারিনি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা
৩ নভেম্বর ২০২৬
মোবাইল ফোনের যোগাযোগ তালিকায় একটা পুরোনো নম্বর এখনো রয়ে গেছে। নামটা দেখলে বোঝার উপায় নেই, নম্বরটির সঙ্গে কত দিনের পরিচয়, কত রাতের গল্প, কত অভিমান জড়িয়ে আছে। প্রায় দুই বছর হলো ওই নম্বরে কথা হয় না। তবু মুছে ফেলা হয়নি।
গত রাতে ফোনের পুরোনো নম্বরগুলো খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ চোখ আটকে গেল সেখানে। আঙুলটা নামের ওপর গিয়ে থামল। মনে হলো, একবার ফোন দিলে কেমন হয়? ওপাশ থেকে কেউ ধরবে কি না, কী বলবে, আদৌ কথা বলার মতো কিছু অবশিষ্ট আছে কি না, এসব ভাবনা মাথায় এল। শেষ পর্যন্ত কল করা হয়নি। ফোনটা বন্ধ করে রেখে দিয়েছিলাম।
অথচ নম্বরটা মুছে ফেলতে পারতাম। কাজটা খুব কঠিন ছিল না। কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। কিন্তু করিনি। কেন করিনি, সেই উত্তর খুঁজতে গিয়েই মনে হলো, মানুষ আসলে সব সময় মানুষকে মনে রাখে না, অনেক সময় তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অভ্যাসটাকে ধরে রাখে।
আমরা যাকে ভালোবাসা বলে চিনতে শিখি, তার অনেকখানিই তৈরি হয় প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস দিয়ে। সকালে ঘুম থেকে উঠে কারও খোঁজ নেওয়া, রাতে ঘুমানোর আগে কথা বলা, কোনো খবর পেলে প্রথমে তাকে জানানো, মন খারাপ হলে তার কাছে যাওয়া। এসব করতে করতে একজন মানুষ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। একসময় তাকে ছাড়া দিন কাটানো কঠিন মনে হয়।
সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও সেই অভ্যাসগুলো একদিনে শেষ হয় না।
সকালে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে হয়তো এখনো মনে হয়, এই খবরটা তাকে জানানো দরকার। কোনো মজার ঘটনা ঘটলে ফোনের দিকে হাত চলে যায়। রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে মনে পড়ে, এই সময়টায় একসময় কথা হতো। তারপর মনে পড়ে, এখন আর হয় না।
এই ফিরে তাকানোকে আমরা অনেক সময় ভালোবাসার গভীরতা বলে ব্যাখ্যা করি। কেউ বলেন, মন যাকে একবার আপন করে নেয়, তাকে কখনো ভুলতে পারে না। কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়। মানুষ অনেক কিছুই ভুলে যায়। কিন্তু কিছু অভ্যাস এত গভীরে গিয়ে বসে যে সেগুলো ভাঙতে সময় লাগে।
এখানেই মনের সঙ্গে আমাদের ভুল বোঝাবুঝি।
আমরা চাই, মাথা যেটা বুঝেছে, মনও যেন সঙ্গে সঙ্গে সেটা মেনে নেয়। সম্পর্কটি আর নেই, তাই তার কথা মনে পড়বে না। মানুষটি ফিরে আসবে না, তাই অপেক্ষাও থাকবে না। কিন্তু অনুভূতির কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। বাস্তবতা মেনে নেওয়ার পরও পুরোনো স্মৃতি হঠাৎ দরজায় এসে দাঁড়াতে পারে।
সমস্যা স্মৃতি ফিরে আসায় নয়। সমস্যা হলো, সেই স্মৃতির কারণে নিজের বর্তমান জীবনকে আটকে রাখা।
আমাদের চারপাশে এমন অনেক সম্পর্ক আছে, যেখানে একজন চলে যাওয়ার পরও অন্যজন একা সম্পর্কটি বয়ে বেড়ান। ফোনের অপেক্ষা করেন, পুরোনো ছবি দেখেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খোঁজ নেন। ওপাশের মানুষটি হয়তো নতুন জীবন শুরু করেছেন, অথচ এপাশে কেউ এখনো পুরোনো কথোপকথনের শেষ বাক্যটি মনে করে বসে আছেন।
এমন অবস্থায় নিজের কাছেই একটা প্রশ্ন করা দরকার, যে সম্পর্কের মধ্যে এখন আর দুজনের উপস্থিতি নেই, সেটাকে একা ধরে রাখার দায়িত্ব কেন আমার?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেকেই নিজের আত্মসম্মান হারিয়ে ফেলেন। বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেন, অবহেলার পরও ফিরে যান, সামান্য মনোযোগ পেলে আবার নতুন করে আশা বাঁধেন। তাঁরা ভুলে যান, কাউকে মনে পড়া আর তার কাছে ফিরে যাওয়া এক বিষয় নয়। কারও জন্য মায়া থাকা মানেই তার সব আচরণ মেনে নেওয়া নয়।
এখানে ভালোবাসাকে অস্বীকার করার কথা বলা হচ্ছে না। বরং ভালোবাসার পাশাপাশি নিজের অবস্থানটাও চিনতে শেখার কথা বলা হচ্ছে।
একটি সম্পর্কের স্মৃতি সুন্দর হতে পারে, কিন্তু সেই স্মৃতির কাছে বর্তমানকে বন্ধক রাখা ঠিক নয়। যে মানুষটি একসময় আপনার জীবনে আনন্দ নিয়ে এসেছিলেন, তাঁর চলে যাওয়ার পর নিজের আনন্দের পথ বন্ধ করে দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। জীবন শুধু পুরোনো সম্পর্কের হিসাব মেলানোর জন্য থেমে থাকে না।
এই অভ্যাসের প্রভাব শুধু প্রেমের সম্পর্কেও সীমাবদ্ধ নয়। বাবা-মায়ের স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকা সন্তান, ভাইবোনের সমান ভালোবাসা না পাওয়া মানুষ কিংবা বন্ধুত্বে বারবার উপেক্ষিত হওয়া কারও মনেও একই রকম অপেক্ষা জমে থাকে। কেউ হয়তো বছরের পর বছর একটি ফোনের অপেক্ষা করেন। কেউ উৎসবের দিনে একটি বার্তার আশায় থাকেন। কেউ আবার জানেন, তাঁর খোঁজ নেওয়ার মানুষটি আর আগের মতো নেই, তবু অপেক্ষা ছাড়তে পারেন না।
এ ধরনের অনুভূতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথমে নিজের কাছে সত্য স্বীকার করতে হয়। বলতে হয়, হ্যাঁ, এখনো মনে পড়ে। হ্যাঁ, কখনো যোগাযোগ করতে ইচ্ছা করে। কিন্তু সেই ইচ্ছা পূরণ করতেই হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।
পুরোনো ছবি মুছে ফেলতে না পারলে নিজেকে দোষ দেওয়ার দরকার নেই। তবে প্রতিদিন ছবিগুলো খুলে নিজের কষ্ট বাড়ানোরও প্রয়োজন নেই। পুরোনো নম্বরটি ফোনে থাকতেই পারে, কিন্তু সেই নম্বরে কল করার অভ্যাসটা ছেড়ে দেওয়া যায়। স্মৃতিকে জায়গা দেওয়া যায়, কিন্তু তাকে জীবনের চালকের আসনে বসানো যায় না।
এখনো সেই নম্বরটি আমার ফোনে আছে। মাঝেমধ্যে যোগাযোগ তালিকা ঘাঁটতে গিয়ে চোখে পড়ে। নামটি দেখে আর কল করার জন্য আঙুল বাড়াই না। মুছে ফেলব কি না, সে সিদ্ধান্তও এখন জরুরি মনে হয় না।
হয়তো মন বেইমান নয়। সে শুধু পুরোনো অভ্যাসের কাছে একটু বেশি সময় চায়। আর সেই সময়টুকু দিতে গিয়ে যেন আমরা নিজের বর্তমানটাকে হারিয়ে না ফেলি।
ফোনের তালিকায় নম্বরটা এখনো আছে। শুধু আগের মতো আর অপেক্ষা নেই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।