নীরবতার ভয় একজন লেখকের অদৃশ্য আতঙ্ক
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৬ মার্চ ২০২৬
রাত তখন প্রায় বারোটা।
একজন লেখক মোবাইলের স্ক্রিনে নিজের সদ্য প্রকাশ করা লেখাটা আবার খুলে দেখেন। কয়েক ঘণ্টা আগে পোস্ট করা হয়েছে। শব্দগুলো ঠিক আছে কি না—শেষবারের মতো চোখ বুলিয়ে নেওয়া।
তারপর অজান্তেই চোখ সরে যায় আরেকদিকে।
নোটিফিকেশন।
কেউ কি পড়েছে?
কেউ কি কিছু বলেছে?
স্ক্রিন নিঃশব্দ।
এই দৃশ্যটা যারা লেখেন, তাদের কাছে খুব পরিচিত। বাইরে থেকে এটি তুচ্ছ মনে হতে পারে—কয়েকটি মন্তব্য না আসা এমন কী বড় ব্যাপার? কিন্তু লেখকের ভেতরে তখন অন্য এক অনুভূতি কাজ করে।
সমালোচনা নিয়ে লেখকদের ভয় আছে—এমন ধারণা অনেকের। কেউ আপত্তি তুলবে, কেউ বলবে লেখা দুর্বল, কেউ বলবে ভাবনাটা ঠিক নয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক লেখক সমালোচনাকে ততটা ভয় পান না।
কারণ সমালোচনা অন্তত একটি জিনিস নিশ্চিত করে—কেউ থেমে পড়েছে।
কেউ সময় নিয়ে শব্দগুলো পড়েছে, কিছু ভেবেছে, তারপর নিজের মত জানিয়েছে। প্রশংসা হোক বা আপত্তি—দুটোই একটি সংকেত দেয়: লেখা কোথাও গিয়ে পৌঁছেছে।
নীরবতা ভিন্ন।
নীরবতা কোনো সংকেত দেয় না।
কখনও কখনও এই নীরবতাই লেখকের মনে অদ্ভুত সন্দেহ তৈরি করে। তিনি আবার নিজের লেখাটাই পড়তে শুরু করেন। হয়তো কোথাও বাক্যটা ঠিক হয়নি। হয়তো ভাবনাটা পরিষ্কার ছিল না। হয়তো পাঠক বুঝতে পারেনি।
এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর থাকে না।
লেখালেখি মূলত একাকী একটি কাজ। একজন মানুষ টেবিলে বসে, সামনে কাগজ বা ল্যাপটপ, চারপাশে নীরবতা। সেই নীরবতার মধ্যেই তিনি নিজের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, দ্বিধা আর ভাবনাগুলোকে বাক্যে পরিণত করেন।
লেখা শেষ হলে সেই ভেতরের জগৎটুকু তিনি পাঠকের সামনে রেখে দেন। যেন বলছেন—আমি পৃথিবীটাকে এভাবেই দেখি।
এই জায়গাটাই সবচেয়ে ভঙ্গুর।
কারণ একজন লেখক যখন লিখছেন, তখন তিনি শুধু তথ্য দিচ্ছেন না; নিজের অনুভূতির একটি অংশও তুলে দিচ্ছেন অন্যের সামনে। তাই পাঠকের প্রতিক্রিয়া তার কাছে কেবল মতামত নয়—এক ধরনের প্রতিধ্বনি।
যদি কোথাও থেকে সেই প্রতিধ্বনি ফিরে আসে, লেখক বুঝতে পারেন—কেউ শুনেছে।
একটি ছোট মন্তব্যও তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
“ভালো লেগেছে।”
“ভাবনাটা নতুন।”
অথবা, “আমি একমত নই।”
এই কয়েকটি শব্দই অনেক সময় লেখকের জন্য নতুন শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।
নীরবতা সেই প্রতিধ্বনি দেয় না।
ধরা যাক, একটি খালি ঘরে দাঁড়িয়ে কেউ কথা বলল। যদি দেয়াল থাকে, শব্দ ফিরে আসে। যদি কিছুই না থাকে, শব্দ মিলিয়ে যায়। তখন বোঝা যায় না—কেউ শুনল কি না।
লেখালেখির ক্ষেত্রেও বিষয়টা অনেকটা এমন।
পাঠকের প্রতিক্রিয়া সেই প্রতিধ্বনির মতো। সেটি লেখককে জানায়—শব্দগুলো কোথাও গিয়ে লেগেছে।
তবে সময়ের সঙ্গে অনেক লেখক একটি বিষয় শিখে ফেলেন। প্রতিটি লেখা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পায় না। কখনও কোনো লেখা দীর্ঘ সময় নীরব থাকে। তারপর অনেক দিন পরে হঠাৎ একজন পাঠক এসে বলেন—অনেক আগে আপনার একটি লেখা পড়েছিলাম।
সেই মুহূর্তে বোঝা যায়, নীরবতা সব সময় অনুপস্থিতি নয়। অনেক সময় সেটি শুধু সময়ের ব্যবধান।
তবু সত্যিটা অস্বীকার করা যায় না—লেখকেরা প্রতিক্রিয়াকে গুরুত্ব দেন। কারণ সেটি লেখাকে একমুখী কাজ হতে দেয় না।
লেখা তখন আর শুধু লেখা থাকে না; এটি কথোপকথনে পরিণত হয়। একজন লেখক লিখে শুরু করেন, আর পাঠক পড়ে সেই কথোপকথনকে পূর্ণ করেন।
এই কারণেই অনেক লেখক সমালোচনাকে ভয় পান না। সমালোচনা অন্তত কথোপকথন চালু রাখে।
নীরবতা কথোপকথন থামিয়ে দেয়।
তাই শেষ পর্যন্ত অনেক লেখকের কাছে সবচেয়ে অস্বস্তিকর অনুভূতি সমালোচনা নয়—নীরবতা।
কারণ নীরবতার মধ্যে কোনো প্রতিধ্বনি নেই। সেখানে শুধু শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।
#লেখক #সাহিত্য #নীরবতা #পাঠকপ্রতিক্রিয়া
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।