শক্তির মুখোশ না বাস্তবের প্রতিবিম্ব
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
নিবন্ধ। এপ্রিল ০৭, ২০২৬
একটা বই খুলে বসেছিলাম এক রাতে। মনে আছে, হালকা বাতাস আসছিল জানালা দিয়ে। প্রথম কয়েক পৃষ্ঠার মধ্যেই নারী চরিত্রটি বলে উঠল—সে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেই নেবে। অদ্ভুতভাবে থেমে গিয়েছিলাম। কারণ কথাটা যতটা সহজ, আমার চারপাশের জীবনে ততটা সহজ নয়।
এই থেমে যাওয়াটাই আসলে ভাবনার শুরু। আমরা যেসব নারী চরিত্রকে দৃঢ় বা নিজের সিদ্ধান্তে অনড় বলে দেখি, তারা কি সত্যিই আমাদের বাস্তবতার ভেতর থেকে উঠে আসে? নাকি তারা এমন এক চিত্র, যা আমরা দেখতে চাই—বা দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি?
রোকেয়ার সুলতানার স্বপ্ন পড়তে গিয়ে প্রথমে খানিকটা অবাকই লেগেছিল। সেখানে নারীরা নিয়ন্ত্রণে, পুরুষরা প্রান্তে—একটা উল্টো দৃশ্য। একটু মজারও মনে হয়েছিল। কিন্তু যত এগিয়েছি, ততই মনে হয়েছে, এই উল্টো ছবিটা হয়তো আমাদের চেনা বাস্তবকেই প্রশ্ন করছে। তসলিমা নাসরিনের লেখায় আবার এক ধরনের সরাসরি অবস্থান দেখা যায়—নারী চরিত্রগুলো দ্বিধা না রেখে নিজের কথা বলে ফেলে। হুমায়ূন আহমেদের কিছু গল্পে সেই দৃঢ়তা এতটা উচ্চস্বরে নয়, কিন্তু নীরবতার ভেতরেই থেকে যায়।
এইসব পড়তে পড়তে মনে হয়েছে—সাহিত্য যেন সরাসরি আয়না নয়। বরং বাস্তব থেকে কিছু টুকরো তুলে নিয়ে, একটু বদলে, নিজের মতো করে সাজানো একটা দৃশ্য। তাই চরিত্রগুলো পুরোপুরি অচেনা লাগে না, আবার পুরোপুরি পরিচিতও নয়। এই অদ্ভুত পরিচিতির মধ্যেই হয়তো তাদের টান।
তবে পাঠকের অভিজ্ঞতা একরকম থাকে না। গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়লে মনে হয়—এমন তো হওয়া উচিত, এমন তো সম্ভব। কিন্তু বই বন্ধ করার পর, যখন নিজের বাস্তবের দিকে তাকাই, তখন সেই অনুভূতিটা একটু সরে যায়। চারপাশের ছোট ছোট আপোষ, চুপ করে থাকা, সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে থেমে যাওয়া—এসব হঠাৎ চোখে পড়ে।
বাস্তবের এই সীমাবদ্ধতা অস্বীকার করার উপায় নেই। অনেক নারী এখনও নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে আটকে যায়—সবসময় নিজের কারণে নয়। পরিবার, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, সমাজের অদৃশ্য চাপ—সব মিলিয়ে পথটা সংকুচিত হয়ে আসে। এই জায়গা থেকে দেখলে সাহিত্যের ওই দৃঢ় চরিত্রগুলোকে মনে হয়—তারা যেন বাস্তবের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। পুরোপুরি দূরে নয়, আবার পুরোপুরি কাছেও নয়।
লেখকের কথাটা এখানে এসে মনে পড়ে। আমি যখন এই চরিত্রগুলো নিয়ে ভাবি, তখন মনে হয়—তিনি শুধু গল্প বলছেন না। কোথাও একটা ইঙ্গিত দিচ্ছেন। হয়তো বলতে চাইছেন, এভাবেও বাঁচা যায়। আবার হয়তো নিজের অস্বস্তিটাই চরিত্রের মধ্যে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। ঠিক বোঝা যায় না। সবসময় বোঝা যায় না।
তবে একটা জায়গায় এসে সংযোগটা ভেঙেও যায়। যখন কোনো চরিত্র খুব বেশি নিখুঁত হয়ে ওঠে, তখন তাকে বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন মনে হয়—এটা কি সত্যিই সম্ভব? সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে পাঠক আর নিজেকে খুঁজে পায় না। একটা নীরব ফাঁক তৈরি হয়। ছোট ফাঁক। কিন্তু স্পষ্ট।
এই কারণেই মনে হয়, এই ধরনের নারী চরিত্রকে একদিকে বাস্তব, আরেকদিকে কল্পনা—এইভাবে আলাদা করে দেখলে পুরোটা ধরা যায় না। তারা একদিকে প্রতিরোধের আভাস দেয়, অন্যদিকে এমন কিছু দেখায়, যা এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়।
প্রশ্নটা তাই সহজ থাকে না। বরং একটু ঘুরে যায়। এই চরিত্রগুলো কি আমাদের নিজেদের জীবনের দিকে নতুনভাবে তাকাতে বাধ্য করে? নাকি আমরা তাদের পড়ি, একটু ভালো লাগে, তারপর আবার আগের মতোই থেকে যাই?
হয়তো এর নির্দিষ্ট উত্তর নেই। থাকলেও সেটি একরকম হবে না সবার জন্য। তবু একটা ব্যাপার থেকে যায়—যে চরিত্র পড়া শেষ হওয়ার পরেও মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে, সে কেবল গল্পে আটকে থাকে না।
আপনার মনে কি কখনো এমন কোনো চরিত্র থেকে গেছে—যাকে পুরোপুরি বাস্তবও মনে হয়নি, আবার পুরোপুরি কল্পনাও না? নাকি আমরা নিজেরাই তাদের মাঝামাঝি কোথাও রেখে দিই?
#
#চিন্তারখোরাক #লেখালেখি
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।