যখন টাকা হয়ে যায় সবচেয়ে বড় মাপকাঠি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬
আজকাল দারিদ্র্য শুধু পকেট খালি থাকার নাম নয়। এটি আমাদের সম্পর্কগুলোকে চুপচাপ ক্ষয় করছে। আমি নিজের চোখে দেখেছি—এক সময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যার সঙ্গে রাত জেগে আড্ডা দিতাম, চাকরি হারানোর পর থেকে ফোন ধরা বন্ধ। কারণ? “ভাই, এখন তোর সঙ্গে দেখা করলে খরচ হবে, আমার তো সেই সামর্থ্য নেই।” টাকার অভাবে বন্ধুত্ব যেন লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটা সময় ছিল যখন সম্পর্ক মাপতাম বিশ্বাস দিয়ে, হাসি দিয়ে, একসঙ্গে চা খাওয়ার সময় দিয়ে। এখন? অনেক ক্ষেত্রেই প্রথম প্রশ্নই হয়—“তোর কেমন চলছে রে? আয়-রোজগার কেমন?” যেন মানুষের মূল্য তার ব্যাংক ব্যালেন্সে। আমার চেনা একটা পরিবারে বিয়ে ভেঙে গেল শুধু যৌতুকের টাকার অভাবে। মেয়েটির বাবা বললেন, “আমরা দরিদ্র, কিন্তু মেয়েকে বিক্রি করব না।” ফল? সম্পর্ক শেষ। মেয়েটি এখন একা লড়ছে, আর ছেলেটির পরিবার নতুন করে বিয়ে দিয়েছে—টাকা দিয়ে।
এই বাস্তবতা নতুন নয়, কিন্তু গত কয়েক বছরে আরও তীব্র হয়েছে। World Bank-এর রিপোর্ট বলছে, ২০২৫ সালে দারিদ্র্যের হার ২২–২৩% ছুঁয়েছে। PPRC-এর হিসাবে, তা প্রায় ২৮%। মূল্যস্ফীতি, চাকরির অনিশ্চয়তা, আর্থিক চাপ—সব মিলিয়ে মানুষের মনে “টাকা ছাড়া কিছু নেই” এই ভাবনা গেঁথে যাচ্ছে।
শিশুরাও এর বাইরে নয়। আমার পাড়ার একটা ছেলে, ক্লাস ফাইভে পড়ে, বাবা বেকার হওয়ার পর স্কুল ছেড়ে দোকানে কাজ শুরু করেছে। সে বলে, “স্যার, বাবা বলে টাকা না থাকলে পড়ালেখা করে লাভ কী?” ভাবুন, শিশুর মনে এই ধারণা ঢুকলে ভবিষ্যৎ কেমন হবে। আমরা কি শুধু সংখ্যা হিসেবে তাকে দেখতে চাই, না সত্যিকার মানুষ হিসেবে?
তবু আমি বিশ্বাস করি, এটা পুরোপুরি অপরিবর্তনীয় নয়। পরিবর্তন শুরু হয় ছোট জায়গা থেকে। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার সময় আমি বলি—“চল, চা-টা আমি দিচ্ছি, কিন্তু তোর গল্প শুনতে চাই। টাকা-পয়সার কথা না।” কেউ অবাক হয়, কেউ হাসে, কিন্তু অনেক আসে। একবার এক বন্ধু বলল, “ভাই, অনেকদিন পর কেউ শুধু আমাকে দেখতে চাইল, টাকা ছাড়া।” সেই মুহূর্তে বুঝলাম—সময় আর আন্তরিকতা এখনো টাকার চেয়ে দামি।
দারিদ্র্য ভয়ানক, কিন্তু মানুষের মধ্যে যে সহানুভূতি, বিশ্বাস, ছোট সাহায্যের হাত বাড়ানোর ক্ষমতা আছে, সেটাও শক্তিশালী। যদি আমরা সম্পর্ককে শুধু টাকার মাপকাঠিতে না মেপে, আবার সময়, শোনা আর সঙ্গ দেওয়ার মাধ্যমে মূল্যায়ন শুরু করি, তাহলে অনেক কিছু বদলাতে পারে।
আমার নিজস্ব কিছু অবজারভেশন বলি। পাড়ার চায়ের দোকানে দেখা যায়, দু’জন বন্ধুর মধ্যে আড্ডা হয়। এক জন বলে, “চল, কালই দেখা করি।” আরেকজন হাসতে হাসতে বলে, “যদি টাকা না থাকে তো?” এই ছোট্ট সংলাপগুলোই আমাদের জীবনের বাস্তবতা। অথচ, যখন কেউ বিনা প্রত্যাশায় সময় দেয়, তখন সম্পর্কটা টিকে যায়—কারণ টাকার পরিবর্তে মানুষি মূল্য থাকে।
আমাদের সমাজে এই পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কিন্তু সম্ভব। শিক্ষার মান, সচেতনতা, এবং ছোট অভ্যাস—যেমন বিনা অর্থে সাহায্য করা, অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া—সব মিলিয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। আমরা চাইলে বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোকে প্রথমে রাখতে পারি। ভালোবাসাকে আর্থিক মাপকাঠিতে মাপতে পারি না।
টাকা দরকার, কিন্তু সব নয়। যে সম্পর্ক টাকার ওঠানামায় টিকে না, সেটা আসলে সম্পর্ক ছিলই না। প্রকৃত সম্পর্ক টিকে যায় অভাবের দিনেও—যদি আমরা চাই। সময়, সততা, আন্তরিকতা—এসবই মানবিক মূল্য। আর এটাই দারিদ্র্যের ভয়াবহতাকে জয় করার একমাত্র শক্তিশালী হাতিয়ার।
#দারিদ্র্যতা #সম্পর্ক #মানুষেরমূল্য
#বন্ধুত্ব #বাংলাদেশ২০২৬
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।