পরিবারে লুকানো মন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | মার্চ ৬, ২০২৬
রুমি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ছিল। সকালের আলো জানালা দিয়ে ঢুকছে, কিন্তু তার চোখে কোনো আলো নেই। পিছন থেকে মায়ের গলা ভেসে এল,
“কফি খাবি?”
ঘাড় নিচু। চোখ মেঝেতে আটকে। হাত কাপড়ের গোটায় মুঠো করে ধরা, যেন সেটা তার একমাত্র সাপোর্ট।
“আজকাল কী হয়েছে তোর?” মা আবার বললেন, গলায় একটা অস্থিরতা।
রুমি ঘুরল। চোখ লাল, ফোলা। ঠোঁটে দাঁত বসানো, যেন কথা বেরোলে সব ভেঙে পড়বে। কোনো কথা বেরোল না। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস, যা মা শোনেননি, বা শুনতে চাননি।
মা চুলায় ফিরে গেলেন। তেল ফুটছিল। একটা ফ্যাঁস শব্দ উঠল, ধোঁয়া ছড়াল। মা নাড়তে থাকলেন, কিন্তু চোখ চুলায় নয়, জানালার বাইরে। হয়তো ভাবছিলেন, এসব কেন হচ্ছে।
আমাদের বাড়িতে সবচেয়ে ভারী কথাটা হলো—
“এইসব কথা বাইরে বলবি না।”
এটা শুনে বড় হয়েছি আমরা। মা হয়তো ভাবছিলেন, লোকে জানলে কী হবে। মেয়ের বিয়ে, আত্মীয়রা কী বলবে—“ওদের বংশে সমস্যা আছে।” সম্মানটা যেন সবচেয়ে বড়। কষ্টটা তার নিচে চাপা পড়ে যায়।
তেলের ধোঁয়ায় মায়ের চোখ ছলছল করছিল। নাকি অন্য কিছু? আমি জানি না। কিন্তু সেই ছলছলটা দেখে মনে হয়, তিনি নিজেও কিছু লুকিয়ে রেখেছেন।
রাতে রুমির ঘর থেকে মৃদু শব্দ আসে। যেন কাঁপা স্বরে কান্না, বা হয়তো শ্বাসের আওয়াজ। দরজা ফাঁক। মা করিডোরে দাঁড়িয়ে। হাতটা দরজায় ওঠে, থেমে যায়। আবার নেমে আসে। ভেতরে কী হচ্ছে, তিনি শোনেন। কিন্তু কিছু বলেন না। হয়তো ভয় পান, কথা বললে সব বেরিয়ে আসবে। তাঁর নিজের কথাগুলোও।
বাবা অফিস থেকে ফেরেন। মাথার যন্ত্রণা লুকিয়ে রাখেন। তাঁর মুখে সবসময় একটা মাস্ক, যেন সব ঠিক আছে। গত শুক্রবার রাতে দেখি—বারান্দায় একা। সিগারেটের আগুন হাতে কাঁপছে। ধোঁয়া উড়ছে, চোখ সরু করে রাস্তার দিকে তাকিয়ে, যেখানে কেউ নেই। শুধু অন্ধকার আর কয়েকটা গাড়ির হেডলাইট।
“বাবা, কী হয়েছে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম, দরজায় দাঁড়িয়ে।
তিনি ঘুরলেন। হাসলেন হালকা, কিন্তু চোখে হাসি পৌঁছোয়নি।
“কিছু না রে।” বলে আবার ধোঁয়া ছাড়লেন।
সেই “কিছু না” আমি অনেকবার শুনেছি। ছোটবেলায় যখন পড়াশোনার চাপে কাঁদতাম, বাবা বলতেন, “কিছু না, সব ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু কখনো জিজ্ঞেস করেননি, কেন কাঁদছি। রুমির চুপ করে থাকা, বাবার এই হাসি—একই ছাদের নিচে দুই প্রজন্মের একই ভাষা। একই লুকানো ব্যথা।
একদিন রুমি জিজ্ঞেস করল, “ভাইয়া, মন খারাপ হলে কী করিস?” তার গলা কাঁপছিল, চোখ নিচু।
“লিখি।” আমি বললাম, বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে।
“আমি পারি না লিখতে। কথা বলতেও না। শুধু কাঁদি। রাতে একা, বালিশে মুখ গুঁজে।”
“তাহলে কাঁদ। কিন্তু কাউকে বল। লুকিয়ে রাখলে আরও ভারী হয়।”
“কাকে? মা ভয় পাবে। বাবা বুঝবে না। থেরাপিস্টের কাছে গেলে লোকে কী বলবে? ‘পাগল হয়ে গেছে’ বলবে তো?”
আমি চুপ হয়ে গেলাম। আমাদের সমাজে এসব কথা এখনো লজ্জার। থেরাপি মানে দুর্বলতা, না কি শক্তি? কিন্তু লোকে বোঝে না। ফলে সমস্যা জমে, বড় হয়।
গত মাসে তার এক বন্ধু সব শুনেছে। কলেজের ক্যান্টিনে বসে, চা খেতে খেতে। “তোর মন খারাপ কেন, বল।” বন্ধু বলেছিল। রুমি সব বলেছে। এখন সেই বন্ধুই তার সবচেয়ে কাছের। আমরা নই। পরিবার নয়। বাইরের কেউ।
গত সপ্তাহে মা রান্নাঘরে বললেন,
“তুই কেমন আছিস, বল তো?” গলায় একটা নতুন স্বর, যেন চেষ্টা করছেন।
রুমি ঘাড় নিচু করল। অনেকক্ষণ চুপ। রান্নাঘরের ঘড়ির টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
“ভালো না, আম্মু।” অবশেষে বলল।
মা কিছু বললেন না। হাত বাড়ালেন না। শুধু শুনলেন। চুলায় নাড়তে থাকলেন, কিন্তু হাত থেমে যাচ্ছিল মাঝে মাঝে। প্রথমবার শুধু শুনলেন।
গত রাতে মা রুমির দরজায় দাঁড়িয়ে নক করলেন। প্রথমবারের মতো।
“আম্মু, ঘুমাতে যাও।” রুমির গলা ভেতর থেকে।
“তুই ঘুমাস নি?”
“না।”
“কফি খাবি?”
দুজনে রান্নাঘরে গেল। আমি শুনতে পেলাম, কাপের শব্দ, চামচের টুংটাং। কথা হলো কি না, জানি না। কিন্তু দরজা খোলা ছিল।
ভোরে ঘুম ভাঙতেই শুনলাম—রুমি ডাকছে। না, মা ডাকছে। না, দুজনে একসাথে। “চা খাবি?” কারো গলা। কফির গন্ধ ভাসছে। দরজাটা খোলা। হয়তো এবার থেকে খোলা থাকবে। কিন্তু কতদিন?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।