পালানোর দেশ কোথায়?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
যে পৃথিবীতে আমাদের সন্তান বেঁচে থাকবে, সেই পৃথিবীটার জন্য আমরা কী জমা করছি?
প্রশ্নটা শুনতে একটু অস্বস্তিকর। কারণ আমরা সন্তানদের ভবিষ্যৎ বলতে সাধারণত বাড়ি, জমি, টাকা, ভালো শিক্ষা কিংবা একটি নিরাপদ চাকরির কথা বুঝি। তাদের জন্য সঞ্চয় করি, সম্পদ তৈরি করি, ভালো স্কুল খুঁজি।
কিন্তু তাদের শ্বাস নেওয়ার বাতাস, পান করার পানি কিংবা বসবাসের মতো একটি পৃথিবী থাকবে কি না, সেই হিসাবটা কতজন রাখি?
ঢাকার একটি ব্যস্ত সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির দিকে তাকান। গাড়ির ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা, ইটভাটার দূষণ—সব মিলিয়ে বাতাসটা হয়তো চোখে দেখা যায় না, কিন্তু শরীরকে এড়িয়ে যায় না। সূক্ষ্ম দূষিত কণা শ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঢোকে। দীর্ঘদিনের বায়ুদূষণ শ্বাসতন্ত্রের রোগের পাশাপাশি হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের মতো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, এই ক্ষতির জন্য কোনো সাইরেন বাজে না।
আজ দূষিত বাতাসে শ্বাস নিয়ে কেউ হয়তো অসুস্থ হয়ে পড়ছে না। কালও না। তাই বিপদটাকে সহজেই উপেক্ষা করা যায়। কিন্তু বছরের পর বছর একই বাতাসে শ্বাস নিতে নিতে শরীর তার মূল্য দিতে থাকে। আর সেই বাতাসে শুধু আজকের মানুষ নয়, তার সন্তানও শ্বাস নিচ্ছে।
শহরের বাইরে দৃশ্যটা আবার অন্যরকম।
উপকূলের একজন কৃষক লবণাক্ত পানির কারণে জমিতে আগের মতো চাষ করতে পারছেন না। মিঠা পানির সংকট বাড়ছে। জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। শেষ পর্যন্ত হয়তো তাকে নিজের গ্রাম ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে হবে।
এটি কোনো কল্পকাহিনি নয়। বিশ্বব্যাংকের জলবায়ু বিশ্লেষণ বলছে, আগামী ৩০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ দেশের ভেতরেই স্থানান্তরিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। কৃষি ও পানির ওপর চাপের পাশাপাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিও এর অন্যতম কারণ।
একজন মানুষ জমি হারিয়ে শহরে এলেন। তারপর আরেকজন। তারপর আরও অনেকে।
শহরের ওপর বাড়ল চাপ। বাড়ল বাসস্থানের প্রয়োজন, পানির চাহিদা, পরিবহন সমস্যা ও কর্মসংস্থানের চাপ। তখন যে সমস্যাটিকে আমরা শুরুতে পরিবেশের সমস্যা বলেছিলাম, সেটিই ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যায় পরিণত হলো।
এটাই পরিবেশ সংকটের আসল বিপদ।
এটি কোনো একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না।
এক দেশের কারখানার ধোঁয়া শুধু সেই দেশের আকাশে আটকে থাকে না। অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ পৃথিবীর জলবায়ুকে প্রভাবিত করে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে কোনো সীমান্তরেখায় গিয়ে তা থেমে যায় না।
বাতাসকে পাসপোর্ট দেখাতে হয় না।
তাই যুদ্ধ থেকে পালিয়ে মানুষ অন্য দেশে যেতে পারে। রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে নিরাপদ জায়গায় চলে যাওয়া যায়। অর্থনৈতিক সংকট থেকে বের হওয়ার জন্য নতুন কোনো দেশেও সুযোগ খোঁজা যায়।
কিন্তু পৃথিবীর পরিবেশ যদি ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে ওঠে, তখন পালানোর দেশটি কোথায়?
সমস্যাটা শুধু মানুষ নিয়েও নয়। আমরা যখন একটি বন কাটি, একটি জলাভূমি ভরাট করি কিংবা একটি নদীকে বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত করি, তখন শুধু একটি গাছ, একটি জলাশয় বা একটি নদী হারাই না। হারাই এমন একটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থা, যার অনেক কাজ আমরা টাকার বিনিময় ছাড়াই পেয়ে আসছিলাম।
কোনো পাখি বীজ ছড়িয়ে দেয়। কোনো পতঙ্গ ফসলের পরাগায়নে সাহায্য করে। কোনো জলাভূমি বন্যার পানি ধরে রাখে। কোনো বন তাপ কমায়।
এসবের মূল্য আমরা সাধারণত তখনই বুঝি, যখন এগুলো আর থাকে না।
তাই উন্নয়নের হিসাবও নতুন করে করতে হবে।
একটি নতুন সড়কের উদ্বোধনের ছবিতে আমরা রাস্তার দৈর্ঘ্য দেখি, প্রকল্পের ব্যয় দেখি, কত দিনে কাজ শেষ হয়েছে তা দেখি। কিন্তু সেই সড়কের জন্য কতটি গাছ কাটা হয়েছে, কতটা জলাভূমি হারিয়েছে, স্থানীয় তাপমাত্রা বা পানি নিষ্কাশনের ওপর কী প্রভাব পড়েছে—এসব হিসাব যদি না থাকে, তাহলে উন্নয়নের ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
উন্নয়ন দরকার। কিন্তু এমন উন্নয়ন, যার বিল পরের প্রজন্মকে পরিশোধ করতে হবে, তাকে উন্নয়ন বলার আগে একটু থামা দরকার।
আমরা সন্তানদের জন্য বাড়ি রেখে যেতে চাই। জমি রেখে যেতে চাই। ব্যাংকে টাকা রেখে যেতে চাই।
কিন্তু তারা যদি পরিষ্কার বাতাস না পায়, নিরাপদ পানি না পায়, চাষের জমি না পায়, বাসযোগ্য শহর না পায়, তাহলে সেই সম্পদের মূল্য কতটুকু?
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো একদিন আমাদের কাছে কোনো হিসাব চাইবে না।
কিন্তু প্রকৃতি হিসাব রাখে।
আজ যে গাছটি কাটা হলো, যে নদীটি দূষিত হলো, যে বাতাসে বিষ মিশল, তার কোনো না কোনো মূল্য একদিন দিতে হবে। প্রশ্ন শুধু কে দেবে।
সম্ভবত আমরা নয়।
আমাদের সন্তানরা।
আর সেই দিন যদি সত্যিই আসে, তখন তাদের সামনে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি হবে না—আমাদের পূর্বপুরুষেরা কত সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন।
প্রশ্ন হবে—
যে পৃথিবীটা তারা পেয়েছিল, সেটাকে তারা বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিল কি না।
আর যদি পৃথিবীটাই বাসযোগ্য না থাকে, তখন পালানোর দেশ কোথায়?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।