মানবিকতার নীরব সংকট
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী সামাজিক প্রবন্ধ
১৩ জুলাই, ২০২৬
একটা সময় ছিল, যখন রাস্তায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে মানুষ ছুটে যেত। কে আপন, কে পর—এসব ভাবার ফুরসত থাকত না। কেউ পানি নিয়ে আসত, কেউ রিকশা থামাত, কেউ আবার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিত। এমন মানুষ এখনো আছে, কিন্তু আগের মতো সহজে চোখে পড়ে না।
এখন প্রায়ই উল্টো চিত্র দেখি। একজন মানুষ রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে, আর তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে ভিড়। সাহায্যের হাত কম, মোবাইলের পর্দা বেশি। কেউ ভিডিও করছে, কেউ লাইভে যাচ্ছে, কেউ হিসেব কষছে—এই দৃশ্যটা কতজন দেখবে, কতটা ভাইরাল হবে।
এমন দৃশ্য দেখে মনের ভেতর একটাই প্রশ্ন বাজে—আমরা কি সত্যিই আগের চেয়ে কম মানবিক হয়ে গেছি?
প্রযুক্তিকে দায়ী করা সহজ। কিন্তু প্রযুক্তির তো নিজের ইচ্ছা নেই। একই মোবাইল দিয়ে একজন অ্যাম্বুলেন্স ডাকেন, আরেকজন সেই মোবাইলেই আহত মানুষের কাতরানি ধারণ করেন। দোষ তাই যন্ত্রের নয়, দোষ আমাদের ব্যবহারের।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের হাতের মুঠোয় দুনিয়া এনে দিয়েছে। দূরের খবর মুহূর্তে পৌঁছে যায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে ঝড়ের বেগে, অসহায় মানুষও সাহায্য পায়। কিন্তু এর আরেকটা মুখ আছে। এখন সবকিছুর আগেই মাথায় আসে—এটা পোস্ট করলে কেমন হবে? কতজন দেখবে? কতটা সাড়া পড়বে?
এই হিসাবটা নিঃশব্দে আমাদের বদলে দিচ্ছে। কখন যে একজন রক্তাক্ত মানুষ ‘মানুষ’ থেকে ‘কনটেন্ট’ হয়ে যায়, আমরা নিজেরাও টের পাই না।
আরেকটা কারণও আছে। রোজ চোখ খুললেই মোবাইলের পর্দায় দুর্ঘটনা, মৃত্যু, মারামারি, কান্নার ভিডিও। প্রথম দিকে বুক কেঁপে উঠত। এখন অনেকেরই গা-সওয়া হয়ে গেছে। বারবার একই দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা কষ্টের সঙ্গেও অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। বাস্তবের রক্তও কখনো কখনো মনে হয় স্ক্রিনের আরেকটা দৃশ্য মাত্র।
তবে সব দায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নয়। আমাদের পরিবার, শিক্ষা আর মূল্যবোধেও বদল এসেছে। আমরা সন্তানকে ভালো রেজাল্ট করতে শেখাই, বড় চাকরির স্বপ্ন দেখাই, সফল হতে বলি। কিন্তু মানুষ হতে শেখাই কতটুকু? বিপদে পাশে দাঁড়ানো, অন্যের ব্যথা বোঝা, নিজের গণ্ডির বাইরে গিয়ে হাত বাড়ানো—এসব নিয়ে কি আগের মতো কথা বলি?
হয়তো বলি না।
আরেকটা কঠিন সত্যও আছে। বেশিরভাগ মানুষ এখন নিজের জীবন নিয়েই ক্লান্ত। সংসারের চাপ, টাকার টানাটানি, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা—এসব মানুষকে ভেতরে ভেতরে গুটিয়ে দিচ্ছে। তাই অন্যের কষ্ট দেখেও অনেকে এগিয়ে আসতে পারে না। এটা ঠিক নয়, কিন্তু এটাই ঘটছে।
তবু আশার আলো নেভেনি। এখনো এমন মানুষ আছেন, যারা নীরবে অন্যের পাশে দাঁড়ান। বন্যা, আগুন, সড়ক দুর্ঘটনা—যে কোনো বিপদে তাদের দেখা মেলে। তারা ক্যামেরার সামনে আসতে চান না। তাদের কাছে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো একজন মানুষকে বাঁচানো। তারা আছেন বলেই এখনো মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস পুরোপুরি উঠে যায়নি।
তাই প্রশ্নটা অন্যকে করার আগে নিজেকেই করা দরকার। আমি যদি কোনো দুর্ঘটনার মুখে পড়ি, প্রথমে কী করব? মোবাইল বের করব, নাকি সাহায্যের জন্য হাত বাড়াব?
আমরা সমাজ বদলের কথা বলি। কিন্তু সমাজ তো আলাদা কিছু নয়। আমি, আপনি, আমাদের ঘর, আমাদের আচরণ—এসব মিলেই সমাজ। পরিবর্তন তাই শুরু করতে হবে নিজেকে দিয়ে।
শিশুরা আমাদের কথা যতটা না শোনে, তার চেয়ে বেশি দেখে। তারা দেখে আমরা কী করি। যদি দেখে বিপদের সময় আমরা ভিডিও করছি, সেটাই তাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আর যদি দেখে অচেনা মানুষের জন্যও আমরা থেমে যাই, সেটাই তারা শিখবে।
মানবিকতা ফেরাতে বড় মিছিলের দরকার নেই। দরকার ছোট ছোট সিদ্ধান্ত। বিপদে কাউকে তুলে ধরা, জরুরি নম্বরে ফোন করা, আহত মানুষের যন্ত্রণাকে কনটেন্ট না বানানো—এই কাজগুলো ছোট মনে হলেও একটা সমাজের চেহারা বদলে দিতে পারে।
দিন শেষে মানুষ মনে রাখে না কে সবচেয়ে ভালো ভিডিও করেছিল। মানুষ মনে রাখে, দুঃসময়ে কে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। একটা ভাইরাল ভিডিওর আয়ু বড়জোর কয়েক দিন। কিন্তু সময়মতো বাড়িয়ে দেওয়া একটা হাত একজন মানুষের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।
মানবিকতার এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। একদিনে মিটবেও না। কিন্তু শুরুটা আজই করা যায়। অন্তত এই প্রতিজ্ঞাটুকু তো করা যায়—বিপদে প্রথমে ক্যামেরা নয়, আগে মানুষ। কারণ শেষ পর্যন্ত আমাদের পরিচয় মোবাইলের ব্র্যান্ড দিয়ে নয়, মানুষের প্রতি আমাদের আচরণ দিয়েই তৈরি হয়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।