মধ্যবিত্তকে নিশানা করা ঠকবাজ ইকোনমি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসপন
বিশ্লেষণেধর্মী ⋄ ১৮ নভেম্বর ২০২৫
শহরের ভিড়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে হয়—মধ্যবিত্তদের মুখে একটা চাপা টেনশন সবসময় লুকিয়ে থাকে।
বাইরে থেকে সেটা বোঝা যায় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা প্রতিদিন একটু একটু করে চাপে ডুবে যায়। কেউ টেরও পায় না। কারণ, মধ্যবিত্তরা নিজের ব্যথা মুখে আনে না—আনতে চায়ও না; এদের ব্যথা দেখানোর সুযোগ কোথায়?
এত নীরবতা, এতো স্বাভাবিক হয়ে থাকা—সব দেখে মাঝে মাঝে মনে হয়, কোনো অদৃশ্য শিকারি দল যেন প্রতিদিন এদের পেছনে ঘুরছে। তারা চুপ থাকে, কিন্তু ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা সারাক্ষণ বাজতে থাকে—একটা অজানা যন্ত্র যেন একটু একটু করে রক্ত চুষে নিচ্ছে।
এই যন্ত্রটার নাম—ঠকবাজ ইকোনমি।
প্রয়োজন—মানুষকে বেঁধে রাখার সবচেয়ে সহজ ফাঁদঃ
আগে মানুষ বিল বেশি এলে রেগে যেত, এখন শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বিলের অঙ্কটা দেখে আর টাকা বা সার্ভিসের কথা মনে পড়ে না—এটা যেন এক ধরণের তাচ্ছিল্য, যা বলে দেয়,
“বাঁচতে হলে আরও দাও, আরও মানিয়ে নাও।”
যে সমাজ বাঁচার খরচকে ব্যবসা বানায়, সেখানে মধ্যবিত্তরা কখনোই স্বাধীন না। তারা কেবল টিকে থাকার ‘সুযোগ’টা ভাড়া নেয়।
মূল্যবৃদ্ধির আসল সাফল্য—সবাই মানিয়ে নেয়ঃ
দাম বাড়ে, মানুষ গুনগুন করে, দোকানদার কাঁধ ঝাঁকায়, মালিক বাড়ি পাল্টায়। আর মধ্যবিত্ত? তারা নিজের অভ্যাস পাল্টায়। আগে দুধ কিনত, এখন কিনে “মাপমতো” দুধ।
আগে যেটা স্বাভাবিক ছিল, আজ সেটাই বিলাসিতা মনে হয়। বাজারের সবচেয়ে বড় ধোকাটা হলো—অভাবকে এমনভাবে সাজানো হয় যেন এটাই স্বাভাবিক।
কিস্তির চাপ—বাইরে স্বপ্ন, ভেতরে শেকলঃ
মধ্যবিত্তদের সবচেয়ে বড় ভুল—স্বপ্নকে কাগজে সই দিয়ে কেনা যায় ভেবে নেয়া। একটা ফোন, বাইক বা ফার্নিচার—সবকিছুর সঙ্গেই লেখা থাকে, “স্বপ্ন আজই নিন, দাম দিন জীবনভর।”
মাসে মাসে কিস্তি হয়তো প্রথমে সামান্য লাগে, পরে সেটা স্থায়ী বোঝা হয়ে যায়। তখনই টের পাওয়া যায়—জীবনের মালিকানা নিজের হাতে নেই, যতই খাটুনি দাও না কেন।
ব্র্যান্ডের ছলে আধুনিক শোষণঃ
এখন আমরা এমন এক সময়ে আছি, যেখানে প্রয়োজন নয়—‘ইমেজ’ই সবকিছু। বাজার বোঝায়, যত আয় করেন, তার চেয়ে বেশি দামের জিনিস কিনলেই আপনি আধুনিক। টাকার অবস্থা না, বরং কতটা ঝলমলে দেখাচ্ছেন সেটাই মুখ্য।
ব্র্যান্ড বেচে না—নিজের ওপর সন্দেহ বেচে। আর এই সন্দেহই ঠকবাজ ইকোনমির সবচেয়ে বড় লাভ।
শিক্ষা ও চিকিৎসা—ভয়ের ব্যবসাঃ
শিক্ষা আর চিকিৎসা এখন মধ্যবিত্তের ওপর সবচেয়ে বড় চাপ। একজন বাবা জানে, সন্তানের পড়াশোনার খরচ দিতে হলে নিজের অনেক কিছু ছাড়তে হবে। মা জানে, অসুখ হলে সঞ্চয়ের সব টাকা উড়ে যাবে।
সবচেয়ে কষ্টকর—সবাই জানে এটা অন্যায়, তবু কেউ প্রতিবাদ করতে পারে না। কারণ প্রতিবাদ মানেই ঝুঁকি, আর ঝুঁকি মানেই পরিবারকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেওয়া।
মাথার উপর ছাদ—জীবনের অর্ধেক দিয়ে কেনাঃ
বাসা ভাড়া, বাড়ির EMI—সব মিলিয়ে নিজের মাথার উপর একটা ছাদ রাখাটাই এখন যুদ্ধ। মধ্যবিত্তরা প্রতিদিন সে যুদ্ধে হারতে হারতে নিজেকে বোঝায়—
‘আরো কয়েক বছর, আরেকটু সহ্য করলেই হবে।’
কিন্তু এই ‘আরো কয়েক বছর’ই অনেক সময় একটা গোটা জীবনের নাম হয়ে যায়।
প্রযুক্তির গোপন খরচঃ
ফোন, ডাটা, অ্যাপ, সাবস্ক্রিপশন—সব মিলিয়ে আধুনিক জীবনে এমন এক নীরব খরচ চাপায়, যা মাসের শেষে গলা টিপে ধরে। স্মার্টফোনের সুবিধা নয়, বরং এই অভ্যাসটাই সবচেয়ে বড় ফাঁদ। অভ্যাস ভাঙা যায়, কিন্তু অভ্যাসের সঙ্গে লেগে থাকা ‘বাধ্যতা’ সহজে কাটে না।
আসল সত্য—মধ্যবিত্তরা ঠকে, কারণ তাদের মনোযোগ বেঁচে থাকার লড়াইয়ে, প্রতারণা খুঁজে বের করার সময় নেই
তারা সহজ-সরল না; তারা ক্লান্ত। এটাই ঠকবাজ ইকোনমির আসল সুযোগ।
যে মানুষ প্রতিদিন শুধু টিকে থাকতে লড়াই করে, সে কখনোই পুরো সিস্টেমের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না।
তাই এই ইকোনমির সবচেয়ে সহজ শিকার—মধ্যবিত্ত।
এরা চিৎকার করে না, দাবি তোলে না, বিদ্রোহ করে না—শুধু ব্যাগটা একটু শক্ত করে ধরে, বাড়ি ফেরার রাস্তা খোঁজে।
#মধ্যবিত্তের_সংকট #ঠকবাজ_ইকোনমি
#অর্থনৈতিক_অন্যায় #নীরব_দারিদ্র্য
#মূল্যবৃদ্ধির_যন্ত্রণা #মধ্যবিত্তের_কথা
#MiddleClassCrisis #CostOfLivingCrisis
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।