মধ্যবিত্তের মুখে সাহিত্যে নীরব উপস্থিতি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী কলাম | ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬
আমার বাবার একটি কালো ট্রাঙ্ক ছিল। স্টিলের, তালা লাগানো। মাস শেষে তিনি খোলার পর আমরা দেখি—কিছু হিসাব মিলেছে, কিছু মিলেনি। ছোটবেলায় ভাবতাম, হয়তো এটাই মধ্যবিত্ত জীবনের সংজ্ঞা—একটি তালা, যার ভেতর সব সমীকরণ মেলে না।
বাংলা সাহিত্যে মধ্যবিত্তের চরিত্ররা প্রায়ই এমনই—নায়ক নয়, খলনায়ক নয়। তারা শুধু আছেন, নিজ নিজ হিসাব মিলিয়ে।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: ভয় এবং অহংকারের মধ্যবিত্ত
দেবদাসের গল্পে আমরা ভয় পাই মধ্যবিত্তের। সমাজের চোখ, পাড়ার কথা, পরিবারের মর্যাদা—এই ভয়ে পার্বতীকে ছেড়ে দিতে হয়। শরৎচন্দ্র বোঝান, বাংলার মধ্যবিত্তের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো তাদের নিজস্ব অহংকার। অহংকারে ভেঙে পড়ার ভয় থাকে।
পার্বতী—মধ্যবিত্ত নারীর প্রতীক। সমাজের নিয়ম মেনে চলেন, কিন্তু অনুভূতি চাপা রাখেন। কাঁদলে হিসাবের খাতায় আরও ঋণ যোগ হবে, তাই কাঁদা যায় না।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়: অভাবের মধ্যে মর্যাদা
অপুর পরিবার গরিব। কিন্তু বিভূতিভূষণ লিখেছেন মধ্যবিত্ত মনস্তত্ত্ব। তাদের হারানোর ভয় নেই, মর্যাদা হারানোর ভয় আছে।
যখন সর্বজয়া ছেলের জন্য একটু ভালো চাল কিনতে পারে না, হাসেন। কাঁদেন না। মধ্যবিত্ত মায়েরা জানেন, কাঁদলে বাচ্চারা বুঝবে, আর হিসাবের খাতায় নতুন ঋণ যোগ হবে।
অপুর কলকাতায় যাত্রা দেখায়—মধ্যবিত্তরা হিসাব করে, স্বপ্ন দেখে, কিন্তু EMI কত হবে ভাবতে ভাবতে থেমে যায়।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: চাওয়া এবং ধ্বংস
পদ্মার তীরে কুবের মাঝি। ধনী নয়, গরিব নয়। তার কাছে নৌকো, স্ত্রী, জীবন। মানিক জানতেন—মধ্যবিত্তের বিপদ হলো একটু বেশি চাওয়া।
কুবের চাইছে যৌনতা নয়, একটি "আমি"—যে নৌকোর বাইরে কিছু। কিন্তু মধ্যবিত্তের কাছে "আমি" ব্যয়বহুল। শেষে কুবের হারায় নৌকো, হৈমন্তী, আর নিজেকে।
শরৎচন্দ্রের চরিত্র ভয় পায়, মানিকের চায়। চাওয়াই ধ্বংসের সূত্র।
আশাপূর্ণা দেবী: সীমান্তের নারীরা
আশাপূর্ণার নারীরা রান্নাঘরে থাকেন, চোখ জানালার বাইরে। সতীশ্বরী, প্রিয়া—মনে মনে সীমান্ত ঠেলে দেখেন।
একদিন মা বলেছিলেন, "আমি যদি পড়াশোনা করতে পারতাম..." আর কিছু বলেননি। আশাপূর্ণার চরিত্ররা এভাবেই থামে। বাকি কথা বলা মানে অসম্পূর্ণ স্বপ্ন লিখে রাখা, যা মিলবে না কিন্তু মনে থাকবে।
মহাশ্বেতা দেবী: নীরবতা ভাঙা
মহাশ্বেতার মধ্যবিত্ত ভিন্ন। রমণী, দ্রৌপদী—প্রশ্ন তোলেন, "কেন?"। মধ্যবিত্তের কাছে এই প্রশ্ন অস্বস্তিকর।
প্রতিবাদী হওয়া মানে হিসাবের খাতায় ভুল ধরিয়ে দেওয়া। সমাজ ক্ষমা করে না।
হুমায়ূন আহমেদ: হাসি দিয়ে ঢেকে রাখা
হিমু হাঁটে, কথা বলে, হাসায়। কিন্তু কেউ জানে না তার সংসার, বাবার অবস্থা। ঢাকার মধ্যবিত্ত তরুণরা হাসি দিয়ে নিজেদের ঢেকে রাখে।
আমার বন্ধু রাতের ফোনে গল্প করত, দিনে চাকরির ইন্টারভিউ দিত। হাসতে হাসতে বলল, "জানিস, বাবা অবসর নিয়েছেন। এখন আমি একমাত্র উপার্জনকারী।"
হাসি ঢেকে রাখার একটি ভঙ্গি। হাঁটলে ঘুম আসে। ঘুমে হিসাব মেলানোর চিন্তা দূরে চলে যায়।
আজ: ট্রাঙ্কের উত্তরাধিকার
বাবার ট্রাঙ্ক এখনও আছে, খালি। কিন্তু আমি এখনো হিসাব করি—ফোনের ক্যালকুলেটরে। ছেলে দেখে, হয়তো ভাবছে—এটাই জীবন।
মধ্যবিত্ত চরিত্ররা বেঁচে আছে, নাম বদলেছে—ব্যাংকার, টিচার, ফ্রিল্যান্সার। ট্রাঙ্ক একই। ভেতরে কাগজ, বাইরে তালা। আমরা জানি—এই তালা কখনো পুরো খুলবে না, তবু চাবি ঘুরাই।
মধ্যবিত্ত মানুষের শক্তি হলো অসম্ভব আশা। একদিন, কোনো একদিন, হিসাব মিলবেই।
শেষ কথা
সাহিত্যে মধ্যবিত্ত কখনো নায়ক হয় না। নায়করা হিসাব মেলাতে হয় না। তারা ঋণ নেয়, পরিশোধ করে না। আমরা পরিশোধ করি—মাসে মাসে, বছরে বছরে। এই নীরব পরিশোধের মধ্যেই আমাদের গল্প।
#মধ্যবিত্ত #বাংলাসাহিত্য #চরিত্রবিশ্লেষণ #পাঠপ্রতিক্রিয়া
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।