ঘরেও কি দেবতা থাকতেন?
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পম্পেইয়ের একটি বাড়ির সামনে দাঁড়ালে আজ চারপাশে মানুষের ঘর নেই। আছে ভাঙা দেয়াল, পাথরের মেঝে, আগুনে পোড়া কাঠের চিহ্ন। অথচ একসময় এই দেয়ালের ভেতরেই মানুষ থাকত, খেত, ঘুমাত, ঝগড়া করত, সন্তান বড় করত। আর প্রতিদিনের সেই জীবনের মধ্যেই ধর্মেরও একটি ছোট জায়গা ছিল।
বড় কোনো মন্দির নয়।
ঘরেরই কোথাও।
পম্পেইয়ের ভেট্টিদের বাড়ির কথা ধরা যাক। বাড়িটি ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কিন্তু তার চাকরদের থাকার অংশেও একটি ছোট লারারিয়াম ছিল—দেয়ালে আঁকা ধর্মীয় চিত্রসহ একটি গৃহস্থালি উপাসনাস্থল। সেখানে কাজ করা এক দাসীর নামও আমরা জানি—ইউটিকিস। প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য থেকে জানা যায়, দাসদের থাকার অংশটি একটি ছোট উঠোনকে ঘিরে ছিল এবং সেখানেই ছিল সেই আঁকা লারারিয়াম।
এই তথ্যটি আমার কাছে প্রাচীন রোমের ধর্ম বোঝার জন্য মন্দিরের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয়।
কারণ এখানে ধর্ম কোনো দূরের বিষয় নয়।
এটা একটা বাড়ির ভেতর।
সেই বাড়িতে মালিক ছিলেন, দাস ছিলেন, রান্নাঘর ছিল, অতিথিদের জন্য আলাদা জায়গা ছিল। আর তাদের মাঝখানেই ছিল এমন একটি স্থান, যেখানে পরিবারের রক্ষাকারী দেবত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হতো।
প্রাচীন রোমানরা এই রক্ষাকারী সত্তাদের বলত লারেস।
লারেসকে আমাদের পরিচিত অর্থে কোনো একক দেবতার সঙ্গে মিলিয়ে ফেললে ভুল হবে। তাঁদের নির্দিষ্ট পৌরাণিক কাহিনি বা চরিত্রও ছিল না। তাঁরা ছিলেন রক্ষাকারী দেবত্ব—বাড়ির, পরিবারের, আবার কখনো রাস্তার মোড় কিংবা কোনো স্থানীয় এলাকার। প্রাচীন রোমের ধর্মীয় জীবনে তাঁদের উপস্থিতি ছিল খুবই বিস্তৃত।
এই জন্যই লারারিয়াম শুধু একটি ধর্মীয় প্রতীক রাখার জায়গা ছিল না। এটি ছিল ঘরের ধর্মীয় জীবনের একটি কেন্দ্র।
পম্পেইয়ের আরেকটি জায়গা আমাদের আরও চমকে দেয়।
ভেটুটিয়ুস প্লাসিডুসের খাদ্য ও পানীয় বিক্রির জায়গার পেছনের দেয়ালে একটি ধর্মীয় চিত্র পাওয়া গেছে। সেখানে লারেসের সঙ্গে দেখা যায় গৃহকর্তার রক্ষাকারী সত্তা, বাণিজ্যের দেবতা মার্কিউরিয়ুস এবং মদের দেবতা বাক্কুসকে। জায়গাটি ছিল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, অথচ তার মধ্যেও ধর্মের জন্য আলাদা স্থান ছিল।
অর্থাৎ একজন রোমানের কাছে ধর্ম আর দৈনন্দিন জীবন আলাদা দুটি ঘর ছিল না।
ব্যবসার ঘরেও ধর্ম ছিল।
রান্নাঘরের কাছেও ধর্ম ছিল।
দাসদের থাকার অংশেও ধর্ম ছিল।
আর বড় মন্দিরে তো ছিলই।
এই জায়গাটিই আমাদের আজকের চোখে অদ্ভুত লাগে।
আমরা ধর্মকে অনেক সময় আলাদা করে দেখি। উপাসনার সময় আলাদা, সংসারের সময় আলাদা। পবিত্র জায়গা আলাদা, সাধারণ জীবন আলাদা।
প্রাচীন রোমে সেই সীমারেখা এত পরিষ্কার ছিল না।
রাষ্ট্রের বড় মন্দির ছিল। রাষ্ট্রীয় উৎসব ছিল। সম্রাটের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্কও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তার পাশাপাশি একজন মানুষ নিজের ঘরেও ধর্ম পালন করত। মেট্রোপলিটন জাদুঘরের শিক্ষামূলক উপকরণে বলা হয়েছে, প্রায় প্রতিটি রোমান পরিবারেই লারেসের মূর্তি বা প্রতিকৃতি থাকত এবং সেগুলো সাধারণত বাড়ির লারারিয়ামে রাখা হতো। কখনো এই স্থানটি বাড়ির মাঝের উঠোনে, কখনো রান্নাঘরের কাছেও থাকত। সেখানে প্রার্থনা, নিবেদন ও অন্যান্য আচার পালিত হতো।
এখানে একটা গভীর ব্যাপার আছে।
ধর্ম শুধু সমাজের ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। পরিবারও তার নিজস্ব ধর্মীয় জগৎ তৈরি করেছিল।
বাড়ির একটি কোণ মানে শুধু দেয়াল আর ছাদ নয়।
সেখানে ছিল পরিবারের নিরাপত্তার আকাঙ্ক্ষা। ছিল পূর্বপুরুষের স্মৃতি। ছিল অদৃশ্য শক্তির ওপর ভরসা। ছিল প্রতিদিনের জীবনের অনিশ্চয়তার মধ্যে একটু নিশ্চিন্ত থাকার চেষ্টা।
হয়তো এই কারণেই ঘরের ধর্মকে বুঝতে গেলে বড় মন্দিরের দিকে তাকালেই হয় না।
একটু নিচু হয়ে ঘরের সেই ছোট কুলুঙ্গিটির দিকেও তাকাতে হয়।
কারণ ইতিহাস শুধু রাজাদের তৈরি মন্দিরে লেখা থাকে না।
কখনো লেখা থাকে রান্নাঘরের পাশে।
কখনো দাসদের থাকার ছোট উঠোনে।
কখনো একটি দেয়ালে আঁকা কয়েকটি ক্ষয়িষ্ণু ছবিতে।
আর কখনো একটি প্রদীপের জায়গায়, যেখানে প্রদীপটি আজ আর নেই—শুধু তার জন্য বানানো স্থানটি পড়ে আছে।
আমাদের নিজেদের ঘরের কথাও তখন মনে পড়ে।
কত ঘরে একসময় ছোট একটি ঠাকুরঘর ছিল। কোথাও একটি তাক। কোথাও দেয়ালের কোণে একটি ছবি। সন্ধ্যা হলে সেখানে প্রদীপ জ্বলত। ঘরের অন্য সবাই হয়তো নিজেদের কাজে ব্যস্ত, কিন্তু ওই ছোট জায়গাটির সামনে এসে কেউ একটু থামত।
সভ্যতা বদলায়।
ঘরের ধরন বদলায়।
দেবতার নাম বদলায়।
কিন্তু মানুষের এই থেমে দাঁড়ানোর অভ্যাসটা কি খুব বদলেছে?
প্রাচীন রোমের ঘরোয়া ধর্মের দিকে তাকালে মনে হয়, মানুষ হয়তো ঈশ্বরকে শুধু আকাশের দিকে খুঁজে নেয়নি। নিজের চারপাশেও তাঁর জন্য একটি জায়গা বানিয়েছে।
একটি মন্দিরে হাজার মানুষ দাঁড়াতে পারে।
একটি ঘরে দাঁড়ায় মাত্র কয়েকজন।
কিন্তু মানুষের বিশ্বাস—দুটো জায়গাতেই সত্যি হতে পারে।
তাই প্রশ্নটা আবার ফিরে আসে—
ঘরেও কি দেবতা থাকতেন?
পম্পেইয়ের পোড়া দেয়াল তার উত্তর মুখে বলে না।
শুধু দেয়ালের এক কোণে দেখিয়ে দেয়—
হ্যাঁ, মানুষের ঘরেও একসময় পবিত্রতার জন্য একটি ছোট জায়গা ছিল।
আর সেই ছোট জায়গাটাই হয়তো বলে দেয়, ধর্মের ইতিহাস শুধু দেবতাদের ইতিহাস নয়।
এটা মানুষের ঘরের ইতিহাসও।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।