বাংলা সাহিত্যে ভিলেন ছাড়া নায়কের অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
নিবন্ধ । এপ্রিল ০৩, ২০২৬
বাংলা সাহিত্য পড়তে গিয়ে একটা প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—যাদের আমরা নায়ক বলি, তাদের উজ্জ্বলতা কি সত্যিই নিজস্ব, নাকি সেটি তৈরি হয় কারও বিপরীতে দাঁড়িয়ে? নায়ককে কি আমরা একা চিনতে পারি, নাকি তাকে বুঝতে হলে সবসময় একটি “অন্য” দরকার হয়?
সোজা কথায় বললে, নায়ক কখনোই একা ধরা পড়ে না। তাকে চিনতে গেলে তুলনা লাগে, আর সেই তুলনার মধ্যেই “অন্যত্ব” তৈরি হয়। এই “অন্য” কখনো ভিলেন নামে পরিচিত হয়, কখনো হয় না—কিন্তু তার উপস্থিতি ছাড়া নায়কের পরিচয় স্পষ্ট হয় না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পাল্টা যুক্তি আসে। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে তো অনেক গল্প আছে যেখানে স্পষ্ট কোনো ভিলেন নেই। সেখানে সংঘাত তৈরি হয় মানুষের নিজের ভেতরের দ্বিধা, সামাজিক চাপ, কিংবা সিদ্ধান্তের টানাপোড়েন থেকে। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়—এখানেও “অন্য” অদৃশ্য হয়নি, শুধু রূপ বদলেছে।
উদাহরণ হিসেবে চিলেকোঠার সেপাই-এর ওসমানকে ভাবা যেতে পারে। এখানে তার সামনে কোনো নির্দিষ্ট ভিলেন নেই। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, আর নিজের ভয়ের সঙ্গে তার লড়াই—এসবই তার প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। প্রশ্নটা তখন দাঁড়ায়: ওসমানের শত্রু কে? বাইরে কেউ, নাকি তার নিজের ভেতরের ভাঙন?
এই ধরনের উদাহরণ দেখায়, ভিলেন আসলে একটি চরিত্রের নাম নয়; এটি একটি অবস্থান। যে কোনো কিছু—মানুষ, সমাজ, কিংবা নিজের দ্বিধা—এই অবস্থান নিতে পারে, যদি তা নায়কের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে।
প্রচলিত বাংলা সাহিত্যে এই বিষয়টি আরও সরলভাবে দেখা যায়। কৃত্তিবাসী রামায়ণ-এ রাম ও রাবণের সম্পর্ক তার একটি পরিচিত উদাহরণ। রাবণ না থাকলে রামের নৈতিকতা, ধৈর্য, বা দায়িত্ববোধ কীভাবে চোখে পড়ত? হয়তো সেগুলো ধারণা হিসেবেই থেকে যেত। রাবণের সঙ্গে সংঘাতই এই গুণগুলোকে স্পষ্ট করে।
তবে এখানে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়—রাবণ কি শুধু বাধা? নাকি সে এমন একটি অবস্থান, যার মাধ্যমে রাম নিজের সীমা ও শক্তি বুঝতে পারে?
একই জিনিস আরও জটিলভাবে দেখা যায় বিষবৃক্ষ-এ। হীরাকে আমরা সহজেই ভিলেন বলি। কিন্তু তার সংলাপ—“তুমি যে সুখী, সে আমার দুঃখের কারণ”—শুনলে বিষয়টা এত সরল থাকে না। হীরা কি সত্যিই খলচরিত্র, নাকি সে এমন এক বঞ্চনার জায়গা থেকে কথা বলছে, যেটা আমরা দেখতে চাই না?
এখানে হীরা শুধু কুন্দনন্দিনীর বিপরীত নয়; সে এমন একটি চাপ তৈরি করে, যা অন্য চরিত্রদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে অস্বস্তিতে ফেলে। তার উপস্থিতি গল্পকে সহজ হতে দেয় না।
এইসব উদাহরণ একসাথে দেখলে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়—নায়কের পরিচয় স্থির নয়, এটি তৈরি হয় সংঘাতের মধ্যে দিয়ে। আর সেই সংঘাতের জন্য কোনো না কোনো “অন্য” সবসময় প্রয়োজন। সেটি দৃশ্যমান ভিলেন হতে পারে, আবার হতে পারে অদৃশ্য এক দ্বন্দ্ব।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সরল হয়ে আসে: নায়ক নিজেকে কীভাবে চিনে? একা দাঁড়িয়ে, নাকি কারও বিপরীতে দাঁড়িয়ে?
সাহিত্য বারবার ইঙ্গিত দেয়—পরিচয় কখনো একা তৈরি হয় না। সবসময়ই তার পাশে থাকে একটি “অন্য”, যে তাকে প্রশ্ন করে, থামায়, বা অন্য পথে ঠেলে দেয়।
এই কারণেই ভিলেন ছাড়া নায়কের অস্তিত্ব কল্পনা করা কঠিন। কারণ ভিলেন শুধু বিরোধী নয়; সে সেই আয়না, যেখানে নায়ক প্রথম নিজের মুখটা স্পষ্ট করে দেখতে পায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।