বিবেকের মৃত্যু শুরু হয় নীরবতা থেকে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী
১৮ জুলাই, ২০২৬
মানুষ একদিনে খারাপ হয়ে যায় না। একটা গাছ যেমন রাতারাতি শুকিয়ে মরে না, মানুষের বিবেকও তেমনি একদিনে মরে যায় না। মৃত্যুটা ঘটে খুব ধীরে। আজ একটা অন্যায় দেখেও কিছু বললাম না, কাল একটা মিথ্যা জেনেও চুপ করে রইলাম, পরশু নিজের সুবিধার জন্য সত্যিটাকে পাশ কাটিয়ে গেলাম। এভাবেই একদিন হঠাৎ টের পাই, ভেতরের সেই অস্বস্তিটা আর হচ্ছে না। যে কাজটা একসময় অন্যায় মনে হতো, সেটাই এখন স্বাভাবিক লাগছে।
আমার মনে হয়, আজকের সমাজের সবচেয়ে বড় সংকট অন্যায় নয়, অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নীরব মানুষ। অন্যায় সব কালেই কিছু মানুষ করে। কিন্তু অন্যায় টিকে থাকে তখনই, যখন চারপাশের মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়।
আমরা চারপাশে কী দেখছি? কেউ ক্ষমতার জোরে অন্যের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে, কেউ মিথ্যা বলেও পার পেয়ে যাচ্ছে, কেউ প্রকাশ্যে দুর্নীতি করে বুক ফুলিয়ে হাঁটছে। যারা দেখছে, তারা জানে এটা ঠিক হচ্ছে না। তবু তারা চুপ। কেউ চাকরি হারানোর ভয়ে, কেউ সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়ে, কেউ আবার শুধু ঝামেলা এড়াতে। আমরা একটা কথা বলে নিজেদের বুঝিয়ে দিই, "এসব ভেবে কী লাভ?"
হয়তো লাভ নেই। কিন্তু ক্ষতি আছে। আর সেই ক্ষতিটা হয় আমাদের ভেতরে। প্রতিবার চুপ থাকার সঙ্গে সঙ্গে আমরা নিজের বিবেকের কাছেই একটু একটু করে হেরে যাই।
সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো, আমরা অন্যায়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ঘুষের খবর শুনে আর চমকাই না। প্রতারণার গল্প শুনে বলি, "এ তো এখন স্বাভাবিক।" কারও ওপর অন্যায় হলে দু-চার মিনিট আলোচনা হয়, তারপর সবাই নিজের কাজে ফিরে যাই। যেন এসব জীবনেরই অংশ।
এই অভ্যাসটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। যখন অন্যায় আর আমাদের নাড়া দেয় না, তখন বুঝতে হবে অসুখটা শুধু সমাজে নয়, আমাদের ভেতরেও ঢুকে পড়েছে।
আরেকটা অসুখ হলো, এখন সত্যের চেয়ে সুবিধার দাম বেশি। সত্য বললে যদি নিজের ক্ষতি হয়, তবে অনেকেই চুপ থাকাটাকেই নিরাপদ মনে করে। অফিসে হোক, পরিবারে হোক বা সমাজে, আমরা ন্যায়ের বদলে সুবিধাকেই বেছে নিই। মনে হয়, একটা ছোট আপস করলে এমন কী ক্ষতি হবে?
কিন্তু বড় অন্যায় কখনো একদিনে তৈরি হয় না। ছোট ছোট আপস জমতে জমতেই একসময় সেটা পাহাড় হয়ে ওঠে। আজ একটা অনিয়ম মেনে নিলাম, কাল আরেকটা। এভাবেই ভুলগুলো একসময় নিয়ম হয়ে যায়।
তাহলে এই নীরবতা থেকে বের হব কীভাবে?
প্রথম কাজ হলো, নিজের ভেতরের অস্বস্তিটাকে বাঁচিয়ে রাখা। যে অন্যায় দেখে একসময় খারাপ লাগত, সেটাকে স্বাভাবিক হতে দেওয়া যাবে না। খারাপ লাগাটাই প্রমাণ করে, বিবেক এখনো বেঁচে আছে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিবাদ মানেই মিছিল বা চিৎকার নয়। নিজের জায়গা থেকে অন্যায়কে অন্যায় বলা, ভুক্তভোগী মানুষটার পাশে গিয়ে দাঁড়ানো, মিথ্যাকে সমর্থন না করা, অন্যায়ের সুবিধা না নেওয়া, এগুলোও বড় প্রতিবাদ। সবাই যদি নিজের অবস্থান থেকে এটুকু করে, তাতেই অন্যায়ের শিকড় নড়ে যায়।
তৃতীয়ত, আমাদের ছেলেমেয়েদের শুধু ভালো রেজাল্ট আর ভালো চাকরির জন্য তৈরি করলে হবে না। তাদের শেখাতে হবে, সত্যের পাশে দাঁড়ানো সবসময় সহজ নয়, তবু সেটাই মানুষের আসল শক্তি। ভালো চাকরি মানুষকে সফল করে, কিন্তু ভালো চরিত্রই মানুষকে সম্মানিত করে।
আমি এখনো বিশ্বাস করি, সমাজ বদলানোর দায় শুধু বড় নেতা বা বড় মানুষের নয়। দায়টা আমাদের সবার। সব লড়াইয়ে জেতা যাবে না, কিন্তু চুপ না থাকাটাও এক ধরনের জয়।
শেষ পর্যন্ত মানুষকে তার টাকা, পদ বা পরিচয় দিয়ে কেউ মনে রাখে না। মানুষকে মনে রাখে তার সাহসের জন্য, তার সততার জন্য, আর সবচেয়ে বেশি মনে রাখে তার বিবেকের জন্য।
আজ আমরা সবচেয়ে বেশি নীরব হয়ে আছি প্রতিদিনের ছোট ছোট অন্যায়ের সামনে। দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার, যোগ্য মানুষকে বঞ্চিত করা, আর মিথ্যাকে মেনে নেওয়ার সামনে। এই নীরবতা একদিন আমাদের সবার জন্য বড় বিপদ ডেকে আনবে। কারণ আজ যে অন্যায়ের সামনে আমি চুপ থাকছি, কাল সেই অন্যায়ই আমার দরজায় এসে দাঁড়াবে, তখন আমার পাশেও কেউ থাকবে না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।