বাংলা সাহিত্যে দারিদ্র্য ও পারিবারিক বিপর্যয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী। এপ্রিল ০১, ২০২৬
দেবদাসের মদের বোতল নয়, আসলে দারিদ্র্যই তো সবচেয়ে বড় নেশা — বাংলা সাহিত্যে এটা কতবার দেখিয়েছে!
যখন দারিদ্র্যের কথা উঠে, তখন আমরা সাধারণত শুধু খালি পেট আর ছেঁড়া জামার ছবি ভাবি। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে দারিদ্র্য আরও নীরব। সেটা পরিবারের ভেতর ঢুকে সম্পর্কগুলোকে ধীরে ধীরে খেয়ে ফেলে। শরৎচন্দ্র আর বিভূতিভূষণ যেভাবে এই ছবি এঁকেছেন, তাতে মনে হয় দারিদ্র্য শুধু অর্থের অভাব নয়, সেটা একটা জীবন্ত অভিশাপ যা মানুষের হাসি, স্বপ্ন আর বন্ধন সবকিছু কেড়ে নেয়।
পল্লীসমাজ-এ শরৎচন্দ্র দেখিয়েছেন, গ্রামের একটা সাধারণ পরিবার কীভাবে অর্থের চাপে ভেঙে পড়ে। রমেশ যখন সমাজ বদলাতে চায়, তখন মহাজনের ঋণ, জমির ঝগড়া আর দৈনন্দিন অভাব তার সব চেষ্টাকে গলা টিপে মেরে ফেলে। পরিবারের সদস্যরা একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। ভাই ভাইয়ের সঙ্গে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে, বাবা-ছেলের সম্পর্কে ফাটল ধরে। দারিদ্র্য এখানে শুধু টাকার অভাব নয়, সেটা মানুষের আত্মসম্মান আর ভালোবাসাকেও ক্ষয় করে দেয়।
শ্রীকান্ত-এ শরৎচন্দ্র নিজের জীবনের ছায়া ফেলেছেন। শ্রীকান্তের জীবনে দারিদ্র্য একটা ছায়ার মতো লেগে থাকে। সে যতই ঘুরে বেড়াক, অভাব তাকে ছাড়ে না। পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক ক্রমশ দূরে সরে যায়। এখানে দারিদ্র্য শুধু খাবারের অভাব নয়, সেটা একটা জীবনধারা হয়ে দাঁড়ায়। মানুষকে অস্থির করে, প্রেম-ভালোবাসাকে দুর্বল করে দেয়।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালীতে দারিদ্র্যের ছবিটা সবচেয়ে করুণ। হরিহর-সর্বজয়ার পরিবারে অভাব যেন প্রতিদিনের সঙ্গী। দুর্গা আর অপুর শৈশব, সর্বজয়ার অসহায়তা, হরিহরের স্বপ্নভঙ্গ — সবকিছুতে দারিদ্র্যের ছায়া। দুর্গার মৃত্যু যখন হয়, তখন মনে হয় অভাব শুধু শরীর নয়, শিশুর স্বপ্নকেও মেরে ফেলেছে। বিভূতিভূষণ দেখিয়েছেন যে দারিদ্র্য পরিবারের ভেতরের উষ্ণতা কেড়ে নেয়, হাসি ম্লান করে দেয়, ভাই-বোনের সম্পর্ককে দূরে সরিয়ে দেয়।
আমাদের পাড়ায় মিত্রমশাই ছিলেন। সবাই ডাকত ‘মিত্রমশাই’। সকালে বেরোতেন কালো অ্যাম্বাসাডার গাড়ি চালিয়ে, কিন্তু বিকেলে গ্যারেজে ফিরতেন একটা টায়ার হাতে নিয়ে। তাঁর ছেলে অমিত আমার বন্ধু ছিল। একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখি অমিতের মা গেটের কাছে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন। পরে জানলাম, মিত্রমশাই গাড়ি বিক্রি করে দিয়েছেন। অমিত আর স্কুলে আসল না। আমরা কথা বলা বন্ধ করলাম — না, ঝগড়া করিনি, শুধু লজ্জা হয়েছিল। দারিদ্র্য তাদের থেকে কেড়ে নিল না, আমাদের থেকে কেড়ে নিল — স্পর্শ করার সাহস।
আজকের শহরে ছবিটা আরও জটিল। মধ্যবিত্তের ফ্ল্যাটের লোনের কিস্তির-এর চাপ, বাড়ি ভাড়া, সন্তানের পড়াশোনার খরচ, চাকরির অনিশ্চয়তা — সব মিলিয়ে একটা অদৃশ্য যন্ত্রণা। বাইরে থেকে দেখলে সব ঠিক আছে, কিন্তু ভেতরে প্রত্যেকে নিজের লড়াইয়ে একা। রাতে খাবার টেবিলে সবাই মোবাইলে ব্যস্ত। কথা বলার বদলে শুধু টাকার হিসাব চলে। গ্রামের দারিদ্র্য ছিল সবার সামনে, শহরের দারিদ্র্য লুকিয়ে থাকে লজ্জার আড়ালে।
সাহিত্য আমাদের শেখায় যে দারিদ্র্য শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, সেটা একটা সামাজিক ও মানসিক বিপর্যয়। যখন পরিবারের সদস্যরা প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন তারা একে অপরের মনের কথা শোনার সময় পায় না। ভালোবাসা, যত্ন, স্নেহ — এগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। বাবা-ছেলে, মা-মেয়ে, ভাই-বোন — সব সম্পর্কই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শরৎচন্দ্র আর বিভূতিভূষণ যে ছবি এঁকেছিলেন গ্রামের পটভূমিতে, সেটা আজ শহরের ফ্ল্যাটেও দেখা যায়। শুধু রূপটা একটু বদলে গেছে। গ্রামে ছিল জমির অভাব, শহরে এসেছে ঋণের অভাব। গ্রামে ছিল মহাজনের চাপ, শহরে এসেছে ব্যাংকের চাপ। কিন্তু ফলাফল একই — পরিবারের ভেতরের বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া।
শহরের ফ্ল্যাটে রাতে লাইট জ্বলে, কিন্তু কারো ঘুম হয় না। লোনের কিস্তির-এর চিঠি আসে, কিন্তু সকালের রুটি ভাজার গন্ধ আসে না। শরৎচন্দ্রের রমেশ, বিভূতিভূষণের অপু — তারা কি জানতো, একদিন দারিদ্র্য এত গন্ধহীন হয়ে যাবে?
তোমার কাছে দারিদ্র্য মানে কী? একটা খালি থালা, না একটা থামা হাত?
#দারিদ্র্য #বাংলাসাহিত্য #পারিবারিকসমস্যা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।