বাংলা সাহিত্যে শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । এপ্রিল ৩০, ২০২৬
বাংলা সাহিত্যকে আমরা প্রায়ই গল্পের ভাণ্ডার হিসেবে দেখি। কিন্তু একটু ধীরে পড়লে বোঝা যায়, এই সাহিত্য আসলে সমাজকে আয়নার সামনে দাঁড় করায়। সেই আয়নায় শিক্ষাব্যবস্থার যে ছবি দেখা যায়, তা সবসময় আরামদায়ক নয়। বরং এমন কিছু দিক সামনে আসে, যেগুলো আমরা সাধারণত এড়িয়ে যেতে চাই।
১৯৩৬ সালে “শিক্ষা” প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সতর্ক করেছিলেন, শিক্ষা যেন কেবল তথ্য অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।
এই কথাটা আমরা অনেকবার উদ্ধৃত করি, কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটা কি বাস্তবতার সঙ্গে সত্যিই মিলছে?
আমরা কি মানুষ তৈরি করছি, নাকি শুধু পরীক্ষায় দক্ষ মানুষ?
এই প্রশ্নটা নতুন না। সাহিত্যের ভেতরেই বহু আগে থেকে এটা ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর পথের পাঁচালী-তে অপুর শেখার প্রবল ইচ্ছা দেখা যায়। সে জানতে চায়, বুঝতে চায়। কিন্তু সুযোগ তার নাগালের বাইরে।
এখানেই প্রথম বড় টানাপোড়েন—প্রতিভা আর সুযোগ সবসময় একসাথে আসে না।
২০১২ সালে আমার গ্রামের স্কুলে আমি দেখেছিলাম, ক্লাস সিক্সের ছাত্র রহিম বিজ্ঞান বইয়ের ছবি দেখে টেস্টটিউব চিনতে পারে না। কারণ স্কুলে কোনো ল্যাব ছিল না।
২০২৬ সালে এসে রহিমের ছেলে ইউটিউবে ল্যাবের ভিডিও দেখে, কিন্তু টেস্টটিউব এখনো হাতে ছুঁয়ে দেখেনি। মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু দূরত্বটা রয়ে গেছে।
শহর আর গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পার্থক্য এখনো স্পষ্ট। শহরে কোচিং, গাইডেন্স, প্রযুক্তি আছে; গ্রামে অনেক জায়গায় এখনো মৌলিক সুযোগ নেই।
এখানে একটা বাস্তব সীমাবদ্ধতা আছে—শুধু সুযোগ তৈরি করলেই সমস্যা শেষ হয় না। অনেক সময় সুযোগ থাকলেও শেখার সংস্কৃতি তৈরি হয় না।
তবু সমাধানের জায়গা আছে।
স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি লার্নিং স্পেস তৈরি করা যেতে পারে, তবে শুধু ভবন নয়—এখানে স্থায়ী মেন্টর, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং আর্থিক স্থায়িত্ব জরুরি।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এর শ্রীকান্ত (দ্বিতীয় পর্ব)-এ শিক্ষিত চরিত্রগুলো জ্ঞানী, কিন্তু দিকনির্দেশনায় অনিশ্চিত।
এখানে প্রশ্ন দাঁড়ায়—শিক্ষা কি শুধু জ্ঞান দেয়, নাকি জীবন বোঝার ক্ষমতাও তৈরি করে?
বর্তমান ব্যবস্থায়ও একই ফাঁক আছে। আমরা শিখি, কিন্তু প্রয়োগে গিয়ে থেমে যাই।
সমাধান হিসেবে “জীবনঘনিষ্ঠ শিক্ষা” বলা হয়, কিন্তু বাস্তবে সমস্যা হলো শিক্ষক-প্রস্তুতি। অনেক শিক্ষক নিজেরাই এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত নন। ফলে কারিকুলাম বদলালেও বাস্তব প্রয়োগ আটকে যায়।
হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, “আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মেধা যাচাই করে না, বরং মুখস্থ করার ক্ষমতা যাচাই করে।”
এই বক্তব্য আংশিক সত্য হলেও পুরো বাস্তবতা নয়। কারণ মুখস্থ করা শুধু সিস্টেম না, এটি একটি সামাজিক অভ্যাস। শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী—সবাই “নিশ্চিত ফলাফল” পছন্দ করে।
তাই প্রশ্নটা আরও গভীর হয়ে যায়—সমস্যা কি শুধু কাঠামোর, নাকি আমাদের প্রত্যাশারও?
পরীক্ষার কাঠামো বদলানোর কথা বলা হয়। বাস্তবভিত্তিক প্রশ্ন অবশ্যই দরকার। কিন্তু এখানেও ঝুঁকি আছে—সব শিক্ষার্থীর বাস্তবতা এক না। ফলে নতুন ধরনের অসমতা তৈরি হতে পারে।
সৈয়দ মুজতবা আলী-এর লেখায় শেখার ভেতরের ক্লান্তি দেখা যায়। শেখা তখন আনন্দ না হয়ে দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।
এখানে সমাধান হিসেবে আলোচনা-ভিত্তিক ক্লাস বলা হয়। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো—সব শিক্ষক কি এই মডেল চালাতে প্রস্তুত?
অনেক জায়গায় শিক্ষক সংকট এখনো বাস্তব সমস্যা।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা শিক্ষার আরেকটি বড় বাধা।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর পদ্মা নদীর মাঝি-তে জীবনের টানাপোড়েন শিক্ষাকে ছাপিয়ে যায়। আজও অনেক শিক্ষার্থী একই বাস্তবতার মধ্যে আছে।
শর্তভিত্তিক বৃত্তি ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে, কিন্তু সেটাও সব সমস্যার সমাধান না। কারণ পারিবারিক চাপ অনেক সময় শিক্ষার চেয়েও শক্তিশালী হয়ে দাঁড়ায়।
আরেকটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন হলো—শিক্ষা কি সত্যিই প্রশ্ন করতে শেখায়?
কাজী নজরুল ইসলাম-এর বিদ্রোহী চেতনা আমরা প্রশংসা করি। কিন্তু বাস্তবে একজন ছাত্র বেশি প্রশ্ন করলে তাকে অনেক সময় সমস্যা হিসেবে দেখা হয়।
এখানে সমস্যা শুধু সিলেবাস না, বরং সংস্কৃতি।
তাই মূল্যায়ন ব্যবস্থায় এমন প্রশ্ন দরকার যেখানে একাধিক উত্তর থাকতে পারে, কিন্তু যুক্তি বাধ্যতামূলক।
এখন প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কি সত্যিই ঘটছে?
আংশিকভাবে হ্যাঁ। প্রযুক্তি এসেছে, তথ্য সহজ হয়েছে। কিন্তু কাঠামোগত সমস্যা কতটা বদলেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
পরীক্ষার চাপ আছে, শুধু রূপ বদলেছে।
মুখস্থনির্ভরতা আছে, শুধু মাধ্যম বদলেছে।
বৈষম্য আছে, শুধু দৃশ্যমানতা কমেছে।
তাহলে প্রশ্নটা আরও সরাসরি হয়ে যায়—আমরা কি সত্যিই পরিবর্তন চাই, নাকি পরিবর্তনের ধারণাটাকেই স্বস্তি হিসেবে ব্যবহার করছি?
কারণ বাস্তব পরিবর্তন মানে অস্বস্তি। এটি শুধু নীতি নয়, বরং অভ্যাস, মানসিকতা এবং প্রত্যাশার সংঘর্ষ।
এই জায়গায় সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি সমাধান দেয় না, কিন্তু এমন প্রশ্ন তোলে যেগুলো উপেক্ষা করা যায় না।
হয়তো এখান থেকেই শুরু। কারণ উত্তর এক না হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন যদি ঠিক জায়গায় থাকে, তাহলে সমাধান নিজে থেকেই পথ খুঁজে নেয়।
আর শেষ প্রশ্নটা হয়তো সবচেয়ে অস্বস্তিকর—
আমরা যে শিক্ষাব্যবস্থা বানাচ্ছি, সেটা একদিন আমাদের সন্তানদের কাছেই জবাবদিহি চাইবে। তখন আমরা কী উত্তর দেব— সিলেবাস দেখাবো, নাকি মানুষ দেখাবো?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।