পথ যা শেখায়
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
অনুলিখন
। ডিসেম্বর ২৮, ২০২৫
যারা বিলাসিতার উঁচু দেয়ালের ভেতরে বাস করেন, তারা হয়তো কখনো বুঝবেন না—অসুস্থতা আর চাকরিহীন জীবন কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে।
সেদিন একটা গ্রুপের অনুষ্ঠান ছিল। যেতে ইচ্ছে করছিল খুব, কিন্তু যাওয়ার ভাড়াটুকুও পকেটে ছিল না। অনুষ্ঠান শেষে দেখলাম, বন্ধুরা তাদের বিলাসবহুল গাড়িতে উঠে চলে যাচ্ছে। গাড়ির গ্লাস তুলে, এসির ঠান্ডা হাওয়ায়, হালকা রবীন্দ্রসংগীতের সুরে চোখ বুজে তারা যাচ্ছে তাদের আরামের গন্তব্যে। তারা দেখবে না বাস্তবের কোনো ছায়া।
আর আমি? হেঁটে ফিরছি বাড়ি। দেড় ঘণ্টার পথ। শীতের রাতে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম, একটা অভুক্ত কুকুর ডাস্টবিনে মুখ গুঁজে খাবার খুঁজছে—যেন তার চোখে লেখা আছে জীবনের সব হতাশা।
একটু এগোতেই চোখে পড়ল রেললাইনের পাশে খালি গায়ে শিশুরা। শীত তাদের স্পর্শ করছে না যেন। বিশাল উচ্ছ্বাসে খেলছে তারা, হাসছে—যেন তাদের জীবনে দুঃখের কোনো জায়গাই নেই।
আরেকটু সামনে মাটির চুলায় এক মা সামান্য খাবার রাঁধছে। কোনো তারকা হোটেলের আড়ম্বর নেই, কিন্তু সেই রান্নায় মিশে আছে তৃপ্তির এক অপরূপ স্বাদ—যা টাকায় কেনা যায় না।
পথে দেখলাম কয়েকজন মিলে খোলা কণ্ঠে গান গাইছে। কোনো বাদ্যযন্ত্র নেই, তবু সেই গান হৃদয় ছুঁয়ে যায়—মনের মাধুরী মিশিয়ে।
বস্তির সামনে এক মা পাটির উপর শুয়ে তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে। পরম মমতায়। শীতের রাতে সেই আলিঙ্গনই তাদের একমাত্র আশ্রয়।
রাস্তার বাজারে এক বাবা দাঁড়িয়ে। নিম্নবিত্তের দক্ষ হিসাবরক্ষকের মতো চরম সতর্কতায় হিসাব কষে কিনছে প্রয়োজনীয় জিনিস। প্রতিটি টাকা যেন তার জীবনের একটা অংশ।
হাঁটা ভারী লাগছিল। দোকান থেকে কিনে নিলাম সস্তা একটা সিগারেট। প্রথম টানে বুকটা ঝাঁকুনি দিল, তবু টানলাম—কারণ পথ এখনো বাকি।
খিরগাঁওয়ের ফুড স্ট্রিটে পৌঁছে দেখলাম উচ্চবিত্তের উঠতি ছেলেমেয়েরা রাতের আলো-আঁধারিতে সময় নষ্ট করছে। মূল্যবান জীবনের মুহূর্তগুলো হারিয়ে ফেলছে, মূল্যবোধ হারাচ্ছে—অথচ তাদের পকেট ভরা টাকা।
ইতিমধ্যে সেই বিলাসী বন্ধুটি বাড়ি পৌঁছে গেছে নিশ্চয়ই, অথবা অন্য কোনো পার্টিতে। পরে সে-ই এসি ঘরে বসে বক্তৃতা দেবে জীবনের আদর্শ নিয়ে, দারিদ্র্য দূর করার সহজ সমাধান বাতলে দেবে।
এবার বলুন তো, কে দেখেছে জীবনকে কাছ থেকে—আমি, না সেই বন্ধুটি?
#পথ_যা_শেখায় #জীবনের_পাঠ #বাস্তবতার_মুখোমুখি #দারিদ্র্য_ও_বিলাস #সমাজের_দুই_দিক #হাঁটার_পথে_দেখা #অনুভূতি #ভাইরাল_লেখা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।