খাঁচার বাইরে আকাশ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা | ০২ অক্টোবর ২০২৬
সম্পর্ক অনেকটা পাখির মতো। তাকে কাছে রাখা যায়, যত্ন করা যায়, ভালোবাসা যায়। কিন্তু ডানা চেপে ধরে রেখে তাকে সুখী করা যায় না।
একটা পাখিকে খাঁচায় রেখে দানা দেওয়া যায়, পানি দেওয়া যায়। অসুস্থ হলে চিকিৎসা করা যায়। খাঁচা পরিষ্কার রাখা যায়, আদরও করা যায়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, তার তো কোনো অভাব নেই।
তবু সে শিকের ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকায়।
কারণ খাবার আর স্বাধীনতা এক জিনিস নয়।
সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আমরা অনেক সময় এই সহজ কথাটাই ভুলে যাই। ভালোবাসার মানুষটির খোঁজ নেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই খোঁজ কখন যে জিজ্ঞাসাবাদ হয়ে ওঠে, সেটা অনেক সময় আমরা নিজেরাও বুঝতে পারি না।
‘কোথায় ছিলে?’
‘এত দেরি হলো কেন?’
‘ওর সঙ্গে এত কথা কীসের?’
প্রশ্নগুলো আলাদা করে খুব কঠিন নয়। কিন্তু প্রতিদিন একই প্রশ্নের সামনে দাঁড়াতে দাঁড়াতে একজন মানুষ একসময় নিজের কাজের চেয়েও তার ব্যাখ্যাটা নিয়ে বেশি ভাবতে শুরু করে।
একদিন অফিস থেকে ফিরতে একটু দেরি হলো। দরজা খুলতেই স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, ‘এত দেরি কেন?’
সে বলল, ‘অফিসে কাজ ছিল।’
‘কাজ ছিল, নাকি কারও সঙ্গে বসেছিলে?’
লোকটা আর কিছু বলল না।
পরদিন অফিসে যাওয়ার সময় বন্ধুর ফোন এলো। আগের দিনের কথা মনে পড়ে ফোনটা ধরল না। বন্ধুত্বটা বদলায়নি, মানুষটাও বদলায়নি। শুধু নিজের আচরণ নিয়ে একটা অকারণ ভয় তৈরি হয়েছে।
এভাবেই সম্পর্কের ভেতরে অনেক খাঁচা তৈরি হয়। কোনো শিক দেখা যায় না, কোনো তালাও থাকে না। শুধু মানুষটা ধীরে ধীরে নিজের কিছু দরজা বন্ধ করে দেয়।
কিছু করার আগে ভাবে, ‘এটা করলে আবার কী হবে?’
কিছু বলার আগে ভাবে, ‘ভুল বুঝবে না তো?’
কোথাও যেতে চাইলে ভাবে, ‘ফিরে এসে কত কথা শুনতে হবে?’
একসময় সে ঝামেলা এড়াতে শুরু করে। তারপর ব্যাখ্যা দেওয়া এড়ায়। তারপর কথা বলাই কমিয়ে দেয়।
বাইরে থেকে তখনও সংসারটা স্বাভাবিক। একই ঘরে থাকা, একসঙ্গে খাওয়া, সন্তানদের নিয়ে ব্যস্ত থাকা, প্রয়োজনীয় কথাবার্তা—সবই চলছে। শুধু যে মানুষটি একসময় নিজের দিনের ছোট ছোট ঘটনাও ভাগ করে নিত, সে এখন চুপচাপ থাকে।
এই চুপ হয়ে যাওয়াটাকে অনেক সময় ভুলভাবে স্বস্তি মনে করা হয়।
‘এখন তো আর ঝগড়া করে না।’
হয়তো ঝগড়া করার মতো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই।
এখানেই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বিপদ। দূরে সরে যাওয়া সব সময় অন্য কারও জন্য হয় না। কখনো মানুষ শুধু নিজের মতো করে বাঁচার জায়গা হারিয়েও দূরে সরে যায়।
প্রতিটি মানুষেরই নিজের একটা ছোট পৃথিবী থাকে। সেখানে কিছু বন্ধু থাকে, কিছু পছন্দ থাকে, কিছু নীরবতা থাকে। এগুলো সম্পর্কের বিরুদ্ধে নয়। এগুলো মানুষ হয়ে থাকারই অংশ।
সেই জায়গাটুকু যদি ভালোবাসার মানুষটি বুঝতে পারেন, সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয় না। বরং আস্থাটা আরও শক্ত হয়।
অবশ্য স্বাধীনতার অর্থও এই নয় যে সম্পর্কে থাকব, আবার নিজের ইচ্ছেমতো অন্যের বিশ্বাস ভাঙব। ভালোবাসা থাকলে কিছু দায়িত্ব থাকেই। কথা রাখার দায়িত্ব, বিশ্বস্ত থাকার দায়িত্ব, ইচ্ছা করে অন্য মানুষটাকে আঘাত না করার দায়িত্ব।
কিন্তু দায়িত্বের নাম করে একজন মানুষের পুরো জীবনটাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
এই ভুলটা নারী-পুরুষ দুজনেই করতে পারেন। একজন স্ত্রী স্বামীর প্রতিটি বন্ধুত্ব নিয়ে সন্দেহ করতে পারেন। একজন স্বামী স্ত্রীর চলাফেরা, পোশাক, ফোন কিংবা বন্ধুত্বের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারেন।
বাইরে থেকে কারণ আলাদা, ভেতরের জায়গাটা একই—অন্য মানুষটাকে হারানোর ভয়। আর হারানোর ভয় থেকেই অনেক সময় মানুষ এমন কিছু করে বসে, যার কারণে সম্পর্কটাই দুর্বল হয়ে যায়।
পাখির জন্য বাসা দরকার। নিরাপত্তা দরকার। কিন্তু আকাশটাও দরকার।
সম্পর্কেও তেমনই। দুজন মানুষের আলাদা কিছু সময় থাকবে, আলাদা পছন্দ থাকবে, নিজের মতো থাকার কিছু জায়গা থাকবে। তবু দিনের শেষে একে অন্যের কাছে ফিরে আসার স্বস্তিটা থাকবে।
সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্ক হয়তো সেটাই, যেখানে কাউকে ধরে রাখার জন্য দরজা বন্ধ করতে হয় না।
দরজা খোলা থাকে।
তবু মানুষটি ফিরে আসে।
কারণ সে বাধ্য হয়ে ফিরে আসেনি, সে ফিরতে চেয়েছে।
কাউকে আটকে রাখা যায়, তার পথ বন্ধ করা যায়, চারপাশে নিয়মের দেয়াল তোলা যায়।
কিন্তু ভালোবাসা যায় না জোর করে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।