মাথা নত করেননি
(আত্মপরিচয় সাহিত্য ও বাঙালির)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণমূলক লেখা |
২২ অক্টোবর ২০২৬
ফররুখ আহমদকে শুধু ইসলামী চেতনার কবি বললে তাঁর সাহিত্যিক বিদ্রোহের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়ালে থেকে যায়। তিনি এমন এক সময়ে বাংলা কবিতা লিখেছিলেন, যখন বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক পরিচয়, সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্য ও আত্মপ্রকাশ নিয়ে নানা বিতর্ক চলছিল। সেই সময়ে নিজের বিশ্বাস, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে কবিতার কেন্দ্রে নিয়ে আসা তাঁর কাছে নিছক সাহিত্যচর্চা ছিল না; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন।
কলকাতার প্রভাব, নিজের স্বর
বিশ শতকের প্রথমার্ধে কলকাতা ছিল বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রকাশনা, পত্রপত্রিকা ও সাহিত্যিক পরিসরের ওপর শহরটির প্রভাব ছিল ব্যাপক। তবে কলকাতার সাহিত্যজগৎকে এককথায় ঔপনিবেশিক মানসিকতার প্রতিনিধি বলা ইতিহাসের সরলীকরণ হবে। সেখানে নানা মত ও ধারার সাহিত্যিকেরাই কাজ করেছেন।
ফররুখের স্বাতন্ত্র্য বোঝার বিষয়টি তাই কলকাতাকে প্রত্যাখ্যান করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্ন হলো, প্রভাবশালী সাহিত্যিক রুচির বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাকে তিনি কতটা জায়গা দিতে পেরেছিলেন।
বাংলা ভাষায় লিখেও তিনি আরবি-ফারসি শব্দভাণ্ডার, ইসলামী ইতিহাস ও মুসলিম ঐতিহ্যকে কবিতায় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বাংলা ভাষাকে ত্যাগ না করে তার ভেতরেই নিজের বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটানো ছিল তাঁর সাহিত্যিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
কবিতায় জাগরণের ডাক
ফররুখ আহমদের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ সাত সাগরের মাঝি তাঁর কাব্যজগতের স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। সমুদ্র, জাহাজ, ঝড় ও যাত্রার চিত্রকল্পে তাঁর কবিতায় নতুন পথ খোঁজার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর কল্পনার নাবিক যেন স্থবিরতা ভেঙে সামনে এগিয়ে যেতে চায়।
এই যাত্রাকে শুধু রোমাঞ্চের গল্প হিসেবে পড়লে এর তাৎপর্য পুরোপুরি ধরা পড়ে না। এর মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া, সংকট অতিক্রম করা এবং হারানো গন্তব্য খুঁজে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে।
তাঁর কবিতায় ইসলামী ঐতিহ্য নিছক অলংকার নয়। বিশ্বাস, ইতিহাস ও নৈতিক আদর্শের সঙ্গে বর্তমানের সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা সেখানে লক্ষ করা যায়। যে সমাজ নিজের পরিচয় নিয়ে দ্বিধায় ভোগে, তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলার আকাঙ্ক্ষা তাঁর সাহিত্যকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে।
দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি কবি
ফররুখকে কেবল ধর্মীয় চেতনার কবি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা তাঁর ‘লাশ’ কবিতায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ক্ষুধা ও মৃত্যুর নির্মম বাস্তবতা তাঁকে সমাজের নৈতিক ব্যর্থতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল।
এখানে তাঁর কবিতার আরেকটি পরিচয় স্পষ্ট হয়। মানুষের আত্মপরিচয় নিয়ে কথা বলা যেমন জরুরি, তেমনি ক্ষুধার্ত মানুষের দুর্দশার দিকে তাকানোও কবির দায়িত্ব। আদর্শের কথা বলেও যদি মানুষের কষ্ট উপেক্ষা করা হয়, তবে সেই আদর্শের মানবিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
মতভেদ থাকুক, পাঠ বন্ধ নয়
ফররুখ আহমদের রাজনৈতিক জীবনও সরলরৈখিক ছিল না। ছাত্রজীবনে বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ থেকে পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আন্দোলনের সমর্থক হওয়া—তাঁর জীবনে রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল। তাঁর সাহিত্যিক অবদান বিচার করতে গেলে এসব অধ্যায়ের পাশাপাশি তাঁর সময়, বিশ্বাস ও সিদ্ধান্তের জটিলতাও বুঝতে হবে।
কোনো কবির সব রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একমত হওয়া জরুরি নয়। কিন্তু মতভেদের কারণে তাঁর সাহিত্যিক অবদান অস্বীকার করাও যুক্তিসংগত নয়। তাঁর ভাষা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার কারও কাছে দুরূহ মনে হতে পারে। তবু এই স্বাতন্ত্র্য বাংলা কবিতার ভাষা ও বিষয়ের পরিসরকে কীভাবে প্রসারিত করেছে, তা বিচার করা দরকার।
আজকের বাংলাদেশেও ফররুখ প্রাসঙ্গিক। ধর্মীয় পরিচয় ও বাংলা সংস্কৃতিকে অনেক সময় পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করানো হয়। অথচ ফররুখের সাহিত্য দেখায়, বাংলা ভাষায় লিখেও নিজের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রকাশ করা সম্ভব। পরিচয়ের একটি দিক তুলে ধরতে গিয়ে অন্য দিক মুছে ফেলতেই হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।
ফররুখ আহমদের বিদ্রোহকে তাই কোনো শহরের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত যুদ্ধ হিসেবে দেখার চেয়ে প্রভাবশালী সাহিত্যিক রুচির মধ্যে নিজের স্বর প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসংগত। তাঁর শক্তি ছিল নিজের ঐতিহ্যকে বাংলা কবিতার বাইরে না রেখে তার ভেতরে জায়গা করে দেওয়া।
তিনি মাথা নত করেছিলেন কি না, তার বিচার শুধু একটি স্লোগানে হয় না। দেখতে হয়, নিজের সময়ের প্রচলিত ধারণার বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি কতটা স্বতন্ত্র ভাষা নির্মাণ করতে পেরেছিলেন।
ফররুখ আহমদের কবিতার গুরুত্ব এখানেই। তাঁর সঙ্গে মতভেদ থাকতে পারে, তাঁর সাহিত্য নিয়ে সমালোচনাও চলতে পারে। কিন্তু তাঁকে বুঝতে হলে তাঁর কবিতা পড়তে হবে, তাঁর সময়কে জানতে হবে। কারণ, নিজের স্বর প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া একজন কবিকে উপেক্ষা করা যায়, কিন্তু তাঁর উত্থাপিত প্রশ্নগুলোকে চিরকাল এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।